দেশব্যাপী চলছে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী ডামাডোল। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় এ নির্বাচনকে ঘিরে সোমবার (৫ জানুয়ারি) থেকে শুরু হয়েছে প্রার্থিতা বাতিলের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে আপিল প্রক্রিয়া।
আপিলের জন্য আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে অঞ্চল ভিত্তিক ১০টি বুথ স্থাপন করা হয়েছে। আগামী ৯ জানুয়ারি বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রার্থী, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বা প্রার্থীর ক্ষমতাপ্রাপ্ত যে কেউ ইসিতে আপিল করতে পারবেন।
তবে, মনোনয়ন বাতিল হওয়া প্রার্থীদের মধ্যে ইসির মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। এরইমধ্যে অনেক রিটার্নিং কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন প্রার্থীরা। দলীয়ভাবেও অনেক নির্বাচন কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
শুধু তাই নয়, বিশেষ কোনো দলের দিকে ঝুঁকে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। ইসির মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রতিদিনই অভিযোগ করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের একটিও আমলে নেয়নি ইসি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের মাঠে এখন প্রার্থী তথা রাজনীতিবিদদের কাঠগড়ায় ইসির মাঠ প্রশাসন। তাদের মতে, যে সব অভিযোগ উঠছে, সেগুলোর তদন্ত করে ব্যবস্থা না নিলে ভোটের পরিবেশ ক্ষুণ্ন হতে পারে। শুধু তাই নয়, প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে পুরো নির্বাচন। শুরু থেকেই ব্যবস্থা না নিলে পরবর্তী সময়ে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। এছাড়া আপিল নিষ্পত্তির সময় যদি কোনো প্রার্থীকে অহেতুক বাতিল করার অভিযোগ উঠে, তখনও ইসির দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। অনেক প্রার্থী মনে করেন, শুরু থেকেই কঠোর মনোভাব না দেখালে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হলে মাঠ নিয়ন্ত্রণ ইসির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে নির্বাচন বিশ্লেষক ও সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. আব্দুল আলীম বলেন, ‘ভালো নির্বাচন করতে হলে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগ তদন্ত করে যদি সত্যতা পাওয়া যায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা না নিলে ভালো নির্বাচন করা সম্ভব হবে না।’
মানিকগঞ্জ জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মানিকগঞ্জ-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি থেকে সদ্য বহিষ্কৃত নেতা আতাউর রহমান আতা বিএনপিরই একাংশের নেতাকর্মীদের মাধ্যমে হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একাধিক সূত্র বলছে, এ ঘটনা ঘটে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, মনোনয়ন যাচাই-বাছাই শেষে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান আতার মনোনয়ন অবৈধ ঘোষণা করেন।
এসময় বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হলে আপত্তি জানান আতাউর রহমান আতা। তিনি বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা ও অনিয়ম সংক্রান্ত প্রমাণপত্র উপস্থাপনের চেষ্টা করেন। এ সময় জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা তাকে কথা বলতে না-দিয়ে থামিয়ে দেন। পরে স্থানীয় বিএনপি ও যুবদল নেতাকর্মীদের দ্বারা তিনি হেনস্তার শিকার হন। এ নিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার তরফে কোনো পক্ষকেই কারণ দর্শানো বা জবাবদিহিতার আওতায় আনার খবর পাওয়া যায়নি।
কুড়িগ্রাম-৩ আসনের এক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিলের ঘটনায় রিটার্নিং কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আসনটিতে দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার অভিযোগে জামায়াতের প্রার্থী মাহবুবুল আলমের (সালেহী) মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। এর প্রতিবাদে সম্মেলন কক্ষের ভেতরে ও বাইরে জামায়াতের বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ করেন।
এ ছাড়া নির্বাচনী পরিবেশ নিয়েও জামায়াতে ইসলামী দলগতভাবে প্রশ্ন তুলেছে। জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ এখনো সৃষ্টি হয়নি। দলটি মনে করছে, প্রশাসনের মধ্যে কিছু কিছু সরকারি কর্মকর্তা একটি বিশেষ দলের পক্ষে কাজ করছেন। বিভিন্ন জায়গায় রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠায় অবসরপ্রাপ্ত বিসিএস অফিসার্স ফোরাম নামে একটি সংগঠন থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহও। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, প্রশাসন বিএনপির দিকে ঝুঁকে গিয়েছে।’
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে হলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান ও কার্যকর উন্নয়ন নিশ্চিত করা অপরিহার্য।’
রাজনীতিবিদ ও দলের পক্ষ থেকে এরকম নানা অভিযোগ উঠার পরও ইসি এ পর্যন্ত কোনো রিটার্নিং কর্মকর্তা বা নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। তাছাড়া অবৈধ অস্ত্র ও চিহ্নিত সন্ত্রাসী ধরতে যৌথ অভিযানের সিদ্ধান্ত ছিল।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি বাস্তবায়নেও ইসির কোনো পদক্ষেপ এখনো দৃশ্যমান নয়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, বড় দলের প্রার্থীদের আচরণবিধি প্রতিপালনে ইসির নমনীয়তা সবসময়ই ছিল। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী যেভাবে দল নিরপেক্ষ মাঠ প্রশাসন থাকার কথা তা অনেক ক্ষেত্রেই অদৃশ্য।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলী বলেন, নিরপেক্ষ প্রশাসনের মানদণ্ড নির্ধারণ হবে আপিল নিষ্পত্তিতে। এখানে যদি অহেতুক কোনো প্রার্থীকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়, তাহলে নির্বাচনী প্রশাসন নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। শুরুতে ব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে।’
নির্বাচন বিশ্লেষক ও রাজনীতিবিদরা মনে করেন, একটি ভালো নির্বাচন করতে হলে ইসিকে শুরু থেকেই কঠোর হতে হবে। কিন্তু বর্তমান নির্বাচন কমিশন এ পর্যন্ত তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখাতে পারেনি। তাই নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হলে ইসির ভূমিকা আরও প্রশ্নের মুখে পড়বে। এর আগেই সতর্ক হতে হবে, বলছেন তারা।
সকাল নিউজ/এসএফ


