কালের গহ্বরে আরও একটি বছর হারিয়ে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, প্রাপ্তি ও প্রার্থনার ভার বহন করে বিদায় নিল ২০২৫। ঘটনাবহুল এ বছরটিতে বেশ ক’টি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ।
লোমহর্ষক এসব অগ্নিকাণ্ডে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়নি, হাজার হাজার মানুষের জীবনও এক মুহূর্তে এলোমেলো হয়ে গেছে। সকাল নিউজের পাঠকদের জন্য বছরের আলোচিত অগ্নিকাণ্ডগুলোর কয়েকটি তুলে ধরা হলো-
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো কমপ্লেক্সে আগুন:
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো কম্প্লেক্সে গেল বছরের ১৯ অক্টোবর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সেখানে বিশাল একটি গুদামে থাকা রপ্তানির জন্য প্রস্তুত পোশাক, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, ওষুধ এবং আমদানিকৃত মূল্যবান মালামাল সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যায়। আগুনে অন্তত ২৫ জন আনসার সদস্যসহ কয়েকজন আহত হন।
ব্যবসায়ীরা জানান, এই ঘটনায় কয়েকশ’ কোটি টাকার পণ্য নষ্ট হয়েছে। অনেক রপ্তানিকারক সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারায় বিদেশি ক্রেতাদের কাছে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বিশ্বাসযোগ্যতাও হারান। আগুনের কারণে বিমানবন্দরের কার্গো কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নাশকতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি; বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল।
পুরান ঢাকার হাজী টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ড:
পুরান ঢাকার হাজী টাওয়ারের ষষ্ঠ তলায় গত ২৩ ডিসেম্বর সকালে আগুন লেগেভবনের একটি বড় অংশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আগুন নেভাতে গিয়ে নিচতলার দোকান ও অফিসগুলোতে পানি ঢুকে বড় ধরনের ক্ষতি হয়। দোকান মালিকরা জানান, কাপড়, ফার্নিচার, কাগজপত্র এবং মালামাল পুড়ে গিয়ে কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পুরনো ভবন, সরু রাস্তা ও ঘনবসতির কারণে ফায়ার সার্ভিসকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে।
গাজীপুরে একই দিনে পাঁচটি অগ্নিকাণ্ড:
২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুর, পাবাইল, চাঁদোনা, কোনাবাড়ি এবং কালিয়াকৈরে মাত্র পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে পাঁচটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে তুলা ও ঝুটের পাঁচটি গুদাম, বসতঘর, দোকান এবং টিনশেড কলোনির অন্তত ৮০টি ঘর পুড়ে যায়। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দিনমজুর পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। কেউ কেউ দোকান, মালামাল ও বসতঘর হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন।
মিরপুরে গার্মেন্টস ও কেমিক্যাল গুদামে অগ্নিকাণ্ড:
২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ঢাকার মিরপুরের রূপনগরের একটি গার্মেন্টস প্রিন্টিং কারখানা ও রাসায়নিক গুদামে ভয়াবহ আগুন লাগে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে কারখানার বড় অংশ পুড়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পোশাক কারখানার নিচ তলায় ‘ওয়াশ ইউনিট’ থেকে আগুন শুরু হয়। পাশের রাসায়নিক গুদামে ছড়িয়ে পড়ার পর বিস্ফোরণ ঘটে। এরপর আগুন চারতলা কারখানার সর্বত্র ছড়িয়ে যায়।
এই ঘটনায় অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু হয় এবং আরও অনেক শ্রমিক আহত হন। এতে একদিনেই কয়েক হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। কারখানা মালিকদের মতে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ শত কোটি টাকার বেশি।
চট্টগ্রাম ইপিজেডে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড:
চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকায় আদম ক্যাপ অ্যান্ড টেক্সটাইল লিমিটেডসহ পাশের ভবনে ২০২৫-এর ১৬ অক্টোবর আগুন লাগে। প্রায় ১৭ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও অন্যান্য সংস্থা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
সাততলা কারখানার ওপরের দুই তলার গুদামঘর সম্পূর্ণ পুড়ে যায় এভং বিপুল পরিমাণ তোয়ালে, কাঁচামাল, মেডিকেল পণ্য ও প্রস্তুত সামগ্রী ধ্বংস হয়। যন্ত্রপাতি, প্যাকেজিং সামগ্রী ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘ সময় আগুন জ্বলে থাকার কারণে ভবনের অভ্যন্তরীণ কাঠামো দুর্বল হয়ে যায়। উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়, কয়েক হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন।
রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে অগ্নিকাণ্ড:
ঢাকার কড়াইল বস্তিতে ২০২৫ সালে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ড ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। প্রায় ১,০০০–১,৫০০ ঘর পুড়ে যায়। হাজার হাজার মানুষ এক রাতেই গৃহহীন হয়ে পড়েন। পাশাপাশি টাকা-পয়সা, কাগজপত্র ও জীবিকার অবলম্বন হারান। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিস, স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয়দের কয়েক ঘণ্টা তৎপর থাকতে হয়।
বস্তির অধিকাংশ ঘর টিন, বাঁশ ও কাঠ দিয়ে নির্মিত। প্রতিটি বাসায় রান্নার জন্য গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার হওয়ায় আগুন আরও তীব্র হয়। সরু গলি, ঘনবসতি ও গাড়ি প্রবেশের অসুবিধার কারণে ফায়ার সার্ভিসের কাজও ব্যাহত হয়।
টঙ্গী এলাকায় ফেমাস কেমিক্যাল গুদামে অগ্নিকাণ্ড:
২২ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় ফেমাস কেমিক্যাল গুদামে ভয়াবহ আগুন লাগে। দাহ্য কেমিক্যাল থাকার কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের সদস্য আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে দগ্ধ হয়ে মারা যান। পার্শ্ববর্তী দোকানের একজন কর্মচারীও আগুনে মারা যান। কেমিক্যাল বিস্ফোরণের কারণে আগুন ভয়াবহ রূপ নেয়।
ফিরে দেখা বছরের অগ্নিকাণ্ডগুলো শুধুই দুর্ঘটনাই নয়, এগুলো হাজারো মানুষের জীবনের গল্প, যারা এক মুহূর্তে সব হারিয়েছেন। এসব ঘটনা প্রশ্ন তোলে, আমরা কতটা নিরাপদ এবং ভবিষ্যতে এমন ক্ষতি ঠেকাতে কতটা প্রস্তুত।
সকাল নিউজ/এসএফ


