বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সম্মানগুলোর মধ্যে এক অনন্য মর্যাদাকর স্বীকৃতির নাম ‘একুশে পদক’। ভাষা আন্দোলনের চেতনা থেকে উৎসারিত এই পদক কেবল একটি পুরস্কার নয়, বরং জাতির মূল্যবোধ, আত্মত্যাগ, সৃজনশীলতা এবং মানবিকতার এক মূর্তমান প্রতীক।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে প্রবর্তিত এই পদক আজও যে তার গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদা অটুট রাখতে পেরেছে—এটি নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক বোধ এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার সততারই প্রমাণ। অনেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় পুরস্কারকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হলেও একুশে পদক দীর্ঘদিন ধরেই সে অর্থে বিতর্কমুক্ত, যা আমাদের আশ্বস্ত করে।

এই পদক যেসব ক্ষেত্রে প্রদান করা হয়—ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, শিক্ষা, গবেষণা, সাহিত্য, শিল্পকলা, সাংবাদিকতা, সমাজসেবা কিংবা বিজ্ঞান—এসব ক্ষেত্রের নির্বাচনও সময়োপযোগী এবং প্রাসঙ্গিক। ফলে এটি শুধু অতীতের সম্মান নয়, ভবিষ্যতেরও এক ধারাবাহিক প্রেরণা।

এ পর্যন্ত যাঁরা এই পদকে ভূষিত হয়েছেন, তাঁদের অনেকেই কখনো স্বপ্ন দেখেননি এমন স্বীকৃতির। তাঁরা কাজ করেছেন নীরবে, নিরলসভাবে, প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকে। যেমন পলান সরকার—যিনি নিভৃতে গ্রামবাংলায় বই পৌঁছে দিয়েছেন মানুষের হাতে, আলো জ্বালিয়েছেন জ্ঞানের। তাঁকে সামনে নিয়ে আসা না হলে হয়তো আমরা তাঁর কথা জানতেই পারতাম না। এই ধরনের মানুষদের খুঁজে বের করে সম্মানিত করার মধ্যেই রাষ্ট্রের সার্থকতা।

তবু প্রশ্ন থেকে যায়—এমন কত গুণী, নিরহংকারী, পরোপকারী মানুষ রয়েছেন, যাঁরা আজও অগোচরেই রয়ে গেছেন! তাঁদের কোনো আক্ষেপ নেই, কারণ তাঁরা স্বীকৃতির জন্য কাজ করেন না। কিন্তু সমাজ হিসেবে আমাদের আক্ষেপ থেকেই যায়। কারণ তাঁদের অভিজ্ঞতা, তাঁদের সেবা, তাঁদের জ্ঞান—এসব থেকে আমরা আরও বেশি উপকৃত হতে পারতাম, যদি সময়মতো তাঁদের যথাযথ সম্মান জানাতে পারতাম।

এই প্রেক্ষাপটেই উঠে আসে একজন বহুমাত্রিক মানুষের নাম—আবুল হাসানাত বাবুল। কুমিল্লার সাংস্কৃতিক, সাংবাদিকতা ও সামাজিক পরিমণ্ডলে তিনি এক সুপরিচিত ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। কিন্তু তাঁর পরিচয় কেবল একটি জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও তাঁর কাজের পরিধি এবং গভীরতা জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি পাওয়ার মতোই।

পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয় দৈনিক থেকে শুরু করে জাতীয় পত্রিকা—বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি কেবল সংবাদ সংগ্রহ বা পরিবেশন করেননি; সাংবাদিকতার নৈতিকতা, শুদ্ধতা এবং দায়িত্ববোধকে নিজের জীবনযাপনের অংশ করে তুলেছেন। তাঁর আচরণ, বচন ও পেশাগত সততা তাঁকে কুমিল্লার সাংবাদিক সমাজে এক আলোকবর্তিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি একজন সম্পাদক, লেখক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠক। দীর্ঘদিন ধরে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্পাদনার মাধ্যমে তিনি মতপ্রকাশের একটি ধারাবাহিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছেন। সাহিত্যচর্চায় তাঁর আগ্রহও সুপ্রতিষ্ঠিত। তিনি জীবনীগ্রন্থ, নিবন্ধ এবং অন্যান্য রচনার মাধ্যমে সমাজের গুণী ব্যক্তিদের তুলে ধরেছেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাঁর লেখা ডা. যোবায়দা হান্নানকে নিয়ে গ্রন্থ, যেখানে একজন সমাজকর্মীর জীবন ও কর্মকে তিনি পাঠকের সামনে জীবন্ত করে তুলেছেন।

ক্রীড়া অঙ্গনেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি একজন দক্ষ ক্রীড়া সংগঠক এবং ধারাভাষ্যকার। কুমিল্লা স্টেডিয়ামে জাতীয় দিবসগুলোর অনুষ্ঠানে তাঁর কণ্ঠ বহু প্রজন্মকে মুগ্ধ করেছে। তাঁর উচ্চারণ, উপস্থাপনা এবং আবেগ—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন এক অনন্য কণ্ঠস্বর। এ ক্ষেত্রেও তিনি জাতীয় পর্যায়ের স্বীকৃতি অর্জন করেছেন।

তবে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান সম্ভবত সাংস্কৃতিক পরিসরে। গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে কুমিল্লা নগর উদ্যানের জামতলায় একুশের অনুষ্ঠানমালা আয়োজন করে আসছেন। “তিন নদী পরিষদ” নামের সংগঠনের মাধ্যমে তিনি যে বিশাল সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করে যাচ্ছেন, তা একক প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা এক বিরল উদাহরণ।

এই দীর্ঘ পথচলায় তাঁর পরিবারের সদস্যরাও তাঁর সহযাত্রী হয়েছেন—যা এই কাজের প্রতি তাঁর নিবেদন ও বিশ্বাসকে আরও গভীরভাবে প্রকাশ করে।

শিশু-কিশোর সংগঠন, সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা, প্রগতিশীল আন্দোলন—সব ক্ষেত্রেই তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। বহু প্রজন্মের লেখক, শিল্পী ও সংগঠক তাঁর কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন।

একইসঙ্গে তিনি একজন সৎ ও নীতিবান মানুষ। তাঁর সততা কেবল ব্যক্তিগত গুণ নয়, এটি তাঁর কর্মজীবনের ভিত্তি। দুর্নীতি প্রতিরোধ কার্যক্রমে তাঁর ভূমিকার জন্য তিনি সম্মানিত হয়েছেন, যা তাঁর চরিত্রের দৃঢ়তার সাক্ষ্য বহন করে।
সমাজসেবার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান গভীর। কুমিল্লায় ডায়াবেটিক সমিতি গঠন, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, অন্ধ কল্যাণ সমিতির কার্যক্রম—এসব উদ্যোগে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।

মানুষের কল্যাণে তিনি নিজেকে বারবার নিয়োজিত করেছেন, কোনো প্রচার বা স্বীকৃতির প্রত্যাশা ছাড়াই।
এখন যদি আমরা একুশে পদকের মূল দর্শনের দিকে তাকাই—ভাষা, সংস্কৃতি, সমাজসেবা, সাংবাদিকতা, মানবিকতা—এই সব ক্ষেত্রেই আবুল হাসানাত বাবুলের সক্রিয় ও উজ্জ্বল উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তিনি কেবল একজন পেশাজীবী নন, বরং একুশের চেতনার ধারক ও বাহক।

তাই প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে—আগামী দিনের একুশে পদকপ্রাপকদের তালিকায় তাঁর নাম কি থাকা উচিত নয়? তাঁর পরিচিত মহলের মানুষদের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট। এখন দেখার বিষয়, রাষ্ট্রের মনোনয়ন প্রক্রিয়া তাঁর এই দীর্ঘ ও নিবেদিত কর্মজীবনের যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারে কি না।

কারণ শেষ পর্যন্ত, একুশে পদকের প্রকৃত মর্যাদা তখনই রক্ষা পায়, যখন তা পৌঁছে যায় সেইসব মানুষের হাতে—যাঁরা নীরবে, নিরলসভাবে, মানুষের জন্য, সংস্কৃতির জন্য, দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version