এই উপমহাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বিরল ও বিস্ময়কর এক পথিকৃৎ- খালেদা জিয়া। যিনি নীতির প্রশ্নে দৃঢ়, গণমানুষের অধিকার আদায়ে আপসহীন এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য অবিচল আর বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আত্মত্যাগে বলিয়ান।

বেগম খালেদা জিয়া এই ভূখণ্ডের হাজার বছরের রাজনৈতির পরম্পরায় প্রথম নারী শাসক। যিনি হয়ে উঠেছেন মানবিকতার প্রচ্ছন্ন প্রতিচ্ছবি আর শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামের দীপ্ত অনুপ্রেরণা। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে তিনি হার না মানা এক মানবিক নেত্রী।

ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনে নানান সংকট-শঙ্কার মধ্যেও তিনি থেকেছেন আপোসহীন। কারো দয়ার দান গ্রহন করেননি; এমনকি শত প্রতিকূলতার মাঝেও বিচক্ষণ নেতৃত্বে সমানভাবে নিজের ও দলের জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছেন। ১৯৪৫ সাল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা থেমেছে মাত্র। প্রলয়ঙ্করী এ বছরের ১৫ আগস্ট অবিভক্ত ভারতবর্ষের জলপাইগুঁড়ির নয়াবস্তির ছোট্ট শহরে আগমন ঘটে ফুটফুটে এক শিশুর। নবজাতকের নাম রাখা হয় খালেদা খানম পুতুল।
সময়ের পরিক্রমায় সেই পুতুলই হয়ে ওঠেন এ দেশের গণতন্ত্রের সমার্থক দেশনেত্রী। যিনি ১৯৯১ সাল থেকে তিনবার বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং হয়ে ওঠেন রাজনীতির এক অনির্বাণ দীপশিখা।

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের ঘটনাবহুল পরিক্রমায় দেশের মহাসংকটে মুক্তিযোদ্ধা জিয়া জনতার জিয়ায় পরিণত হন। ঐতিহাসিক সিপাহি জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তিনি শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। তাঁর পুরো শাসনকালে বেগম জিয়া ছিলেন পাদপ্রদীপের অন্তরালে। ১৯৮১ সালে কতিপয় দুষ্কৃতিকারীদের বুলেটের আঘাতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শাহাদাত বরণের পর রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। তাঁকে অপসারণ করে ক্ষমতা দখল করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ।

স্বামী জিয়াউর রহমান মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পুরোদস্তর গৃহবধূই ছিলেন বেগম জিয়া। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর বাস্তবতা তাঁকে টেনে আনে রাজনীতির জটিল সমীকরণে। একদিকে দলীয় কোন্দল, অপরদিকে এরশাদের মন্ত্রিসভায় বিএনপির অনেক নেতার যোগদানে দলটি অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। সেই বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে দলকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে হাল ধরেন খালেদা জিয়া। তৎকালীন বিএনপির সিনিয়র কিছু নেতার পরামর্শ এবং অনুরোধে রাজনীতিতে অবির্ভূত হন লাজুক এই গৃহবধূ।
শুরু হয় তাঁর বিপ্লব-সংগ্রামের দুর্বোধ্য পথচলা। জিয়ার মৃত্যুর ঘটনা তাঁর ভেতর এক ধরণের আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা এনে দেয় । তিনি হয়তো ভেবেছেন রাজনীতি মানুষকে এমনই দুর্বিসহ পরিণতির দিকে টেনে নেয়। তারপরও তিনি শক্ত হাতে হাল ধরে দলকে দেশের বৃহত্তর ও জনপ্রিয় এক রাজনৈতিক দলে অবতীর্ণ করেন। একের পর এক চমক দেখিয়ে হয়ে ওঠেন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। ১৯৮৩ সালে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং পরবর্তীতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি দায়িত্ব নেন। ১৯৮৪ সাল থেকে দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সাথে দলের চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮২ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তৎকালীন স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলন খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিকভাবে পরিণত করে তোলে। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এরশাদের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে ওঠে। এ সময় তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতা দলকে শুধু সুসংগঠিতই করেনি নেতৃত্বের মানদণ্ডে রাজনীতির নানান বাঁকে তাঁকে বারংবার উত্তীর্ণ করেছে।
১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়া সাতবার কারারুদ্ধ হয়েছেন। প্রতিবারই তিনি জ্বলে ওঠেন আরও বেশি শক্তি হয়ে।
সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর নেতৃত্বের স্ফুরন। তিনি হয়ে ওঠেন অধিক থেকে অধিকতর জনপ্রিয়। রাজনীতির মাঠে যা ছিল অভূতপূর্ব। এক এক পর্যায়ে তাঁকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। অনেকেই তখন সমঝতার নীতি গ্রহণ করলেও তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে আপস করেন নি। যে কারণে তাকে ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

গণমানুষের ধারে ধারে তাঁর অদম্য ছুটে চলা, তৃণমূলে নিবিড় যোগাযোগ, সভা-সমাবেশে বিচক্ষণতার সাথে বক্তৃতা তাঁকে একজন বিদগ্ধ রাজনৈতিক নেতায় পরিণত করে। তিনি হয়ে ওঠেন জুলুম-নিপীড়ন, অত্যাচার-অবিচারের বিপরীতে গণমানুষের অধিকার আদায়ের আশ্রয়স্থল।
৯০-এ ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। আর জনগণের রায়ে জননন্দিত এ নেত্রী ১৯৯১ সালের নির্বাচনে দেশের শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। এই জয় কিন্তু এতো সহজে আসেনি। নির্বাচনের আগে তার দৃঢ় মনোবল, অমানবিক পরিশ্রম, দেশব্যাপী বিরামহীন ছুটেচলা, বিএনপি’র পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি করে। তাঁর নির্বাচনী জনসংযোগ এতই গতিময় ছিল যে, তখন মাত্র দুই মাসে তিনি প্রায় ১৮০০টি জনসভা ও পথসভায় বক্তৃতা করেন। ১ দিনে তিনি সর্বোচ্চ ৩৮টি পথসভায় বক্তৃতা করেছিলেন। এমনকি টানা ৪৮ ঘন্টা পর্যন্ত নির্ঘুম থাকার রেকর্ডও রয়েছে তাঁর।

খালেদা জিয়া সে সময় মাত্র পাঁচ দিনের সফরে চার জেলায় ৭১টি সভায় ভাষণ দিয়েছিলেন। শেষ দুই সপ্তাহে তিনি ২০১টি সভা করেছিলেন। তিনি দেশের প্রতিটি প্রান্তে মানুষের কাছে গিয়েছেন; তাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনেছিলেন। এমনকি তাদের মঝে পরিবর্তনের আশা জাগাতে পেরেছিলেন। সেই ত্যাগ ও নিরলস পরিশ্রমের প্রতিদান পেয়েছিলেন ১৯৯১’র নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মধ্য দিয়ে।
ঐতিহাসিক সে নির্বাচনে বিএনপি ১৪০ টি আসন পেয়ে এককভাবে সরকার গঠন করে এবং দেশের বৃহত্তর দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। যেখানে আওয়ামী লীগ পায় ৮৮ টি, জাতীয় পার্টি পায় ৩৫ টি এবং জামায়াতে ইসলামী পায় ১৮ টি আসন। এটি শুধু রাজনৈতিক জয়ই নয়, একজন সাধারণ নারী গণমানুষের নেত্রী ও রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত।

বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালের ১৯শে মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এরপর ১৯৯৬ সালে এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি আরো দুইবার বিজয় লাভ করে। জাতীয় নির্বাচনে যতবার যত আসনে তিনি প্রার্থী হয়েছেন সবখানেই তিনি বিপুলভোটে বিজয়ী হয়েছেন। তিন মেয়াদে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা এ দেশের উন্নয়ন ও রাজনীতির ইতিহাসে মাইলফলক।
এদেশের রাজনীতিতে তাঁর এই অপ্রতিরুদ্ধ ছুটে চলা বারবার প্রমান করেছে, শুধু উত্তরাধিকারই নয়, গণমানুষের অধিকার আদায়ে আত্মনিবেদিত হতে পারলে তাদের হৃদয়ের সর্বোচ্চ আসনে পৌঁছানো যায়। খালেদা জিয়ার অসামান্য আত্মত্যাগ তেমনি এক উজ্জ্বল কীর্তি।

সেনাসমর্থিত ওয়ান ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। কারাগারে থাকাকালে তাঁকে বিদেশে নির্বাসনে পাঠানোর চেষ্টা হলেও তিনি আপোষ করেননি। এদেশের মানুষের সাথেই তিনি নিজের ভাগ্যকে মিলিয়ে নিয়েছেন। দীর্ঘ কারাবাসের পর আইনি লড়াইয়ে হাইকোর্টের আদেশে তিনি মুক্তিপান। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর ওয়ে ওঠায় নেতা-কর্মীরা তাকে ‘গণতন্ত্রের মা’ উপাধিতে আখ্যায়িত করেন।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদ করা হয়।
ওয়ান ইলেভেন সরকারের করা মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, পরে সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করা হয়। প্রথমে পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কারাগারে নিয়ে রাখা হয় বিএনপি চেয়ারপারসনকে। একই বছরের এপ্রিলে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে রাজধানীর বিএসএমএমইউ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এরপর ক্রমেই অসুস্থ হতে থাকেন রাজনীতির অধম্য এই নেত্রী।

২০২০ সালে করোনা পরিস্থিতিতে নির্বাহী আদেশে বেগম জিয়ার সাজা স্থগিত করা হয়। গুরুতর অসুস্থতায় পরিবার ও দল থেকে বারবার বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার দাবি জানালেও সরকার তা নাকচ করে দেয়। ৫ আগস্ট ২০২৪, ছাত্র-জনতার অভ্যুথানের মধ্য দিয়ে দেশনেত্রীর বন্দিজীবনের অবসান ঘটে।
অবশেষে, ২০২৫-এর ৮ জানুয়ারি উন্নত চিকিৎসার জন্য বেগম জিয়াকে লন্ডনে নেওয়া হয়। ১১৭ দিন লন্ডনে অবস্থান শেষে অনেকটা সুস্থ হয়ে গত ৬ মে তিনি দেশে ফিরেন। প্রায় ৮০ বছর বয়সী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে লিভার সিরোসিস, কিডনি জটিলতা, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিসসহ নানা শারীরিক অসুস্থতায় আক্রান্ত।

গত ২৩ নভেম্বর রাতে অসুস্থ হয়ে পড়লে বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে লন্ডনে নিতে প্রস্তুতি নেওয়ার হলেও শেষ পর্যন্ত শারীর অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় সম্ভব হয়নি।
এই অসুস্থ্যতা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সকল নির্যতন-নিপীড়ন ও আপোসহীনতা তাকে গণতন্ত্রের চূড়ান্ত পথিকৃত হিসেবে গণমানুষের কাছে প্রতিয়মান করেছে। কেননা
প্রিয় নেত্রীকে এক পলক দেখতে এবং তাঁর সুস্থতা কামনায় দেশবাসীর আকুতি তারই সাক্ষ্য দেয়।

একজন মানুষ, একজন রাজনৈতিক কখন গণমানুষের এতটা গভীরে পৌঁছাতে পারেন? তাঁর জন্য কতটা দুর্লব পথ মাড়াতে হয়, কতটা সুখ-স্বার্থ বিসর্জন দিতে হয়? এর সবটুকুই দিয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। যে কারণে তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালির হৃদয় থেকে হৃদয়ে মিশে থাকা হার না মানা এক মহিয়সী, গণমানুষের সত্তায় লালিত গণতন্ত্রের এক অবিচ্ছেদ্য বাতিঘর।

মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। তাঁর এই চলে যাওয়া দেশ ও দেশের রাজনীতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

সকাল নিউজ/এসএফ

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version