পৃথিবীর মায়া ছাড়লেন বরেণ্য সংগীতশিল্পী, সুরকার এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক মলয় কুমার গাঙ্গুলী। গতকাল সোমবার রাতে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
তার মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছে শিল্পীর পরিবার। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। বরেণ্য এই শিল্পীর মৃত্যুতে সংগীতাঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
কণ্ঠযোদ্ধা তিমির নন্দী এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘এম এ মান্নান ভাইয়ের পর এবার চলে গেলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক, সহযোদ্ধা, কিংবদন্তি লোক সংগীতশিল্পী শ্রদ্ধেয় মলয় কুমার গাঙ্গুলী দা! আমরা দিনে দিনে খুব একা হয়ে যাচ্ছি! এই শূন্যতা পূরণ হবার নয়। যেখানে আছেন, ভালো থাকুন, মলয় দা। দেশের জন্য আপনার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
জানা গেছে, মলয় কুমার গাঙ্গুলীর মরদেহ মিরপুরে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে রাখা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী শিল্পীর একমাত্র মেয়ে দেশে এলেই শেষকৃত্য নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
নেত্রকোণার কেন্দুয়ার মোজাফফরপুর গ্রামে ১৯৪৪ সালে জন্ম নেওয়া এই গুণী সঙ্গীতজনের জীবনজুড়ে ছিল দেশপ্রেম আর সুরের সাধনা। মহান মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে কণ্ঠকে অস্ত্র বানিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী ও সুরকার মলয় কুমার গাঙ্গুলী।
১৯৭১ সালে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে বাড়ি ছাড়েন মলয় কুমার গাঙ্গুলী। তিনি কলকাতায় গিয়ে যোগ দেন স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে নিয়মিত গান রচনা, সুরারোপ এবং কণ্ঠ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা জুগিয়েছেন তিনি।
স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে ‘পুত্রবধূ’ সিনেমায় ‘গুরু উপায় বলো না’ গানটি গেয়েছিলেন তিনি। পর্দায় ঠোঁট মিলিয়েছিলেন প্রয়াত অভিনেতা প্রবীর মিত্র। সে গানটি মলয় কুমার গাঙ্গুলীকে তখন তুমুল জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল। তার গাওয়া ‘আমার মনতো বসে না গৃহ কাজে সজনী গো’, ‘অন্তরে বৈরাগীর লাউয়া বাজে’-এর মতো গানগুলো এখনো মানুষের কণ্ঠে শোনা যায়।
মলয় কুমার গাঙ্গুলীর ক্যারিয়ারের অন্যতম মাইলফলক হলো ১৯৯০ সালে আওয়ামী লীগের সম্মেলনের জন্য তৈরি করা ঐতিহাসিক গান ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত, বঙ্গবন্ধু মরে নাই।’ গীতিকবি হাসান মতিউরের লেখা ওই গানে তিনি সুরারোপ করেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের সময় ‘জনতার নৌকা’ অ্যালবামে গানটি অন্তর্ভুক্ত হলে তা সারাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাবিনা ইয়াসমীনের কণ্ঠে গানটি পুনরায় রেকর্ড করিয়ে নেন। ২০২০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার মলয় কুমার গাঙ্গুলীকে ২০ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছিল।
মৃত্যুুর পরে কোনো আনুষ্ঠানিক সম্মান বা স্বীকৃতির কোনো আবেদন তার নেই, সে কথাও জীবদ্দশায় স্পষ্টভাবে জানিয়ে গেছেন তিনি।
সকাল নিউজ/এসএফ


