বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমিরের ভেরিফায়েড এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে দেওয়া একটি ‘নারীবিদ্বেষী’ পোস্ট এবং পরবর্তীতে অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার দাবি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সর্বমহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

এবার এ প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলীয় চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি বলেন, ‘নারীবিদ্বেষী পোস্টের প্রায় ৯ ঘণ্টা পর সমালোচনার মুখে আইডি হ্যাকের যে দাবি করা হয়েছে, তা কতটা যৌক্তিক?’

রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর গুলশানে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন এসব কথা বলেন।

সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন বলেন, ‘আমরা সবাই জানি, কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো দ্রুততম সময়ে জনগণকে অবহিত করা, যাতে বিভ্রান্তি না ছড়ায়। কিন্তু এখানে দেখা গেল, জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর হঠাৎ করে হ্যাকিংয়ের দাবি তোলা হয়েছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এই দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য? এমনকি উক্ত সময়ের মধ্যে জামায়াত আমিরের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে অনেক পোস্ট হয়েছে, যার মধ্যে আমরা তার এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার কোনো পোস্ট দেখতে পাইনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘জামায়াত পক্ষ থেকে রাত ৩টা ৩০ মিনিটে হাতিরঝিল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তারা বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার বিষয়টি জানতে পেরেছেন। মাহদী আমিনের প্রশ্ন, ‘যদি তাই হয়ে থাকে, তবে প্রায় ১২ ঘণ্টা পরে কেন জিডি করা হলো? এই বিলম্বের আদৌ কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা আছে কি? তাছাড়া হ্যাক হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই অ্যাকাউন্ট ফিরে পাওয়ার দাবিটিই বা কতটা বিশ্বাসযোগ্য?’

বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি যে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান, তার ভেরিফায়েড এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে নারীদের উদ্দেশ্য করে যে নোংরা, জঘন্য ও অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করেছেন বলে দেশব্যাপী যে আলোচনা চলছে, সেটি সঠিক হলে এর মাধ্যমে পুরো সমাজব্যবস্থাকে মধ্যযুগীয় অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার প্রচেষ্টা বলে মনে করি।’

মাহদী আমিন বলেন, জামায়াত আমির তার এক্স হ্যান্ডেলে ৩১ জানুয়ারি বিকেল ৪টা ৩৭ মিনিটে যা লিখেছেন, তার একটি অংশ অনুবাদ করলে দাঁড়ায়: ‘আমরা বিশ্বাস করি যে যখন মহিলাদের আধুনিকতার নামে ঘর থেকে বের করা হয়, তখন তারা শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় এবং নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়; এটি অন্য কোনো রূপে পতিতাবৃত্তির মতোই।’

এই মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, ‘আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আমরা সর্বদা নারীদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, সম্মান ও সমঅধিকারের পক্ষে। এই ধরনের ভাষা ও মানসিকতা কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এটি প্রকাশ্যেই নারীবিদ্বেষী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ।’

বিএনপির এই নেতা অভিযোগ করেন, জামায়াতের জন্য এটি নতুন কোনো আচরণ নয়। এই দলটির একজন নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে অশালীন শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। দলের প্রধান নারীদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনার মতো পশ্চাৎপদ বক্তব্য দিয়েছেন। যে দল “ইনসাফ কায়েমের” কথা বলে, তারা একটি আসনেও কোনো নারীকে সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়নি।

তিনি আরও যোগ করেন, সেই দলের একজন সদস্যকে আমরা টকশোতে দেখলাম, নারীদের সংসদে যাওয়াকে তাচ্ছিল্য করে “ট্রফি”র সাথে তুলনা করেছেন। আমরা দেখলাম, এই দলটি প্রকাশ্যে বারবার ঘোষণা দিয়েছে, তাদের দলের প্রধান পদে কোনো নারী কখনোই আসতে পারবে না। অথচ তাদের নারীরাই বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের এনআইডি কার্ড ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করছে। এটাই কি তাদের তথাকথিত ইনসাফ?

তিনি বলেন, আমরা আরও দেখেছি, এই দলের সঙ্গে নির্বাচনি জোটে যুক্ত থাকার কারণেই জোটভুক্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বহু নারী নেত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকেই প্রকাশ্যে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। যারা জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করছেন, তারাও স্বীকার করেছেন যে এই দলটির কারণে তারা নানাভাবে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।
মাহদী আমিন বলেন, ‘এমনকি নারী প্রার্থীদের পোশাক-পরিচ্ছেদ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা চরম রুচিহীনতা ও নারীবিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ। আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, বিভিন্ন আসনে আমাদের প্রার্থীদের নারী সদস্যরা নির্বাচনি প্রচারণায় নামলে তাদেরকেও অনলাইন, অফলাইনে নানাভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে।’

নারীদের জাতীয় অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের বিশ্বজয়ে আমাদের নারীদের বিরাট অবদান রয়েছে। স্কুল, হাসপাতাল, পুলিশ, প্রশাসন, সাংবাদিকতা ও খেলাধুলাসহ সব ক্ষেত্রে তারা সফল। গত জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানেও আমরা দেখেছি আমাদের বোনেরা কীভাবে পুলিশের সামনে সাহসের সঙ্গে দাঁড়িয়েছে।’

তিনি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময়ও শত্রুপক্ষ নারীদের ওপর অত্যাচার ও নিপীড়নের পথ বেছে নিয়েছিল। মায়ের মতোই দেশ কিংবা দেশই তো আমাদের মা। তাদের ওপর আর কোনো অন্যায়-অবিচার বিএনপি মেনে নেবে না।’

সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে মাহদী আমিন বলেন, জামায়াত বলে তাদের নাকি ‘দেখার পালা’। কিন্তু দেশের মানুষ ইতোমধ্যে দেখা শুরু করেছে যে মধ্যযুগীয় বর্বরতার নামে কীভাবে অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অপমান করা হচ্ছে। তিনি ঘোষণা করেন, ‘দেশজুড়ে ও অনলাইনে নারীর মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস নেই, কোনো ভয় নেই, কোনো পিছু হটা নেই।’

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সিনিয়র সহ-সভাপতি ইয়াসীন আলী প্রমুখ।

সকাল নিউজ/এসএফ

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version