বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতির গর্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে প্রতিষ্ঠিত রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে চলনবিলের জমি ভরাটের পরিকল্পনা। ২২টি পরিবেশ ও সামাজিক সংগঠন একযোগে মত দিয়েছে- বিশ্ববিদ্যালয় হোক, তবে চলনবিলের প্রাণহানি ঘটিয়ে নয়।
বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) ঢাকার রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনগুলো স্পষ্টভাবে জানায়, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার বুড়ি পোতাজিয়া এলাকায় ১০০ একর জমি বালু দিয়ে ভরাট করে ক্যাম্পাস নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। শুধু বালু ভরাটেই ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৪৮ কোটি টাকা, আর পুরো প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ৫১৯ কোটি টাকা। এই ভরাট কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে চলনবিলের প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হবে, হুমকির মুখে পড়বে জীববৈচিত্র্য ও মাছসহ কৃষি উৎপাদন, আর ক্ষতিগ্রস্ত হবে প্রায় এক কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সভাপতি অধ্যাপক নূর মোহাম্মদ তালুকদার, নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী প্রধান জাকির হোসেনসহ বিভিন্ন পরিবেশকর্মী। গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন চলনবিল রক্ষা আন্দোলনের সদস্য সচিব এস এম মিজানুর রহমান। তিনি জানান, কেবল বালু ভরাটের অর্থ দিয়েই শাহজাদপুরের আশপাশের উঁচু জমি কিনে সেখানে ক্যাম্পাস নির্মাণ করা সম্ভব।
পাশাপাশি তিনি বিকল্প প্রস্তাবও দেন যে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কাছারিবাড়ির আশপাশে দখল হয়ে যাওয়া জমিদারি সম্পত্তি উদ্ধার বা সরকারি হুকুমে দখলের মাধ্যমে জমি ক্রয় করে বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করা যেতে পারে। আরেকটি প্রস্তাবে বলা হয়, সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ ১ হাজার ১৫৬ একর জমির মধ্যে একটি সুবিধাজনক অংশকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব।
গবেষণাপত্রে চলনবিলের গুরুত্বও তুলে ধরা হয়। বিস্তীর্ণ এই বিল জুড়ে আছে ৬টি জেলার ৩৬টি উপজেলা। আয়তন প্রায় এক হাজার ৮৮ বর্গকিলোমিটার। পদ্মা-যমুনাসহ ৪৭টি নদী এর মধ্যে প্রবাহিত হয়। এখানে রয়েছে ১৬৩টি ছোট-বড় বিল, তিন শতাধিক খাল, এক লাখ ২০ হাজার পুকুর, অন্তত চারটি বিশাল পাথার। চলনবিলের প্রাণবৈচিত্র্যও সমৃদ্ধ—১০৫ প্রজাতির দেশি মাছ, ৩৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৭ প্রকার উভচর, ৩৪ প্রজাতির পাখি এবং অসংখ্য জলজ ও স্থলজ উদ্ভিদ। বলা হয়, দেশের প্রাকৃতিক সম্পদে চলনবিল এক অমূল্য ভাণ্ডার।
সংবাদ সম্মেলনে নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী প্রধান জাকির হোসেন বলেন, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের গর্ব। তাঁর নামে বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু কাছারিবাড়ি থেকে মাত্র ১১ কিলোমিটার দূরে পরিবেশগতভাবে এত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ক্যাম্পাস নির্মাণের যৌক্তিকতা নেই।”
বাপার সভাপতি নূর মোহাম্মদ তালুকদারও একই সুরে বলেন, “আমরা রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করছি না। কিন্তু চলনবিল ধ্বংস করে এই ক্যাম্পাস নির্মাণ করা কবিগুরুর চেতনার বিরোধী হবে।”
বাপার সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির স্মরণ করিয়ে দেন, বিল ভরাট করা কেবল পরিবেশবিধি লঙ্ঘন নয়, এটি ২০০০ সালের জলাশয় রক্ষা আইন ও ২০১৩ সালের পানি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। পানি আইনের ২০ ধারা অনুযায়ী পানিপ্রবাহ বন্ধ করে কোনো স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ। উপরন্তু দেশের উচ্চ আদালত নদনদীকে জীবন্তসত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। অথচ বর্তমানে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য যিনি, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। আইন বিষয়ে তাঁর অজ্ঞ থাকা সম্ভব নয়। তাই আশা করা হচ্ছে, তিনি শিক্ষার্থীদের বিষয়টি বুঝিয়ে বলবেন এবং আইনবিরোধী কোনো উদ্যোগ নেবেন না।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিকল্প স্থানে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবিতে শিগগিরই পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেওয়া হবে।
এই অনুষ্ঠানে অংশ নেয় বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), চলনবিল রক্ষা আন্দোলন, এএলআরডি, নাগরিক উদ্যোগ, বারসিক, বাদাবন সংঘ, ডব্লিউবিবি ট্রাস্ট, পরিবেশ বার্তা, সিডিপি, গ্রীন ভয়েস, গ্রীন সেভার্স, চিলড্রেন ওয়াচ ফাউন্ডেশন, কাপ, উন্নয়ন ধারা ট্রাস্ট, ক্যাপস, তিস্তা নদী রক্ষা কমিটি, নদী পক্ষ, বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশন, নদী পরিব্রাজক দল, আরডিআরসি, এএসডিএস ও সোসাইটি ম্যানেজমেন্ট ফাউন্ডেশন।
অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের নামে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের স্বপ্নকে কেউ নস্যাৎ করতে চায় না। প্রশ্ন কেবল একটাই—এ স্বপ্নের মূল্য কি চলনবিলের প্রাণ হারিয়ে দিতে হবে?
সকাল নিউজ/এসএফ


