কক্সবাজার শহর এখন উৎসবের রঙে ভরপুর। একদিন পরে ঈদুল ফিতর। সমুদ্রসৈকতে নামবে পর্যটকের ঢল, হোটেল-রেস্তোরাঁয় বাড়বে ব্যস্ততা। সে উপলক্ষে সাজানো হয়েছে পুরো শহ। আর বিপণিবিতানে চলছে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা। চারদিকে আলো, আনন্দ আর প্রস্তুতির উচ্ছ্বাস।

কিন্তু এই উৎসবমুখর শহরেরই এক কোণে কলাতলীর পূর্ব অংশে দক্ষিণ আদর্শ গ্রাম এলাকায় কয়েকটি ঘরে গভীর নীরবতা। সেখানে নেই ঈদের প্রস্তুতি, নেই নতুন কাপড়, নেই আনন্দের ছোঁয়া। আছে শুধু এক রাতের আগুনে পুড়ে যাওয়া জীবন আর সেই আগুনের দগদগে স্মৃতি।

আগুনের রাত, ছাই হয়ে যাওয়া স্বপ্ন :

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে কলাতলী বাইপাস সড়কের নবনির্মিত ‘কক্সবাজার এলপিজি স্টেশন’ এ ঘটে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, প্রথমে গ্যাস লিকেজ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। কর্মচারীরা বালু ও পানি ছিটিয়ে তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে এবং আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে। আগুনের তীব্রতা এতটাই ছিল যে কয়েক শ মিটার দূর থেকেও তাপ অনুভূত হচ্ছিল। আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসেন মানুষ। কেউ ছুটে যান প্রাণ বাঁচাতে, কেউ চেষ্টা করেন আগুন নেভাতে।

ফায়ার সার্ভিস, সেনা ও বিমানবাহিনীসহ মোট নয়টি ইউনিট চার ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু ততক্ষণে পুড়ে যায় অন্তত ১০টি বসতঘর, একটি বড় গ্যারেজে রাখা প্রায় ৩০টি গাড়ি এবং আশপাশের বিভিন্ন স্থাপনা। দগ্ধ হন অন্তত ১৫ জন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাকায় পাঠানো হয়। গুরুতর দগ্ধ তিনজন পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

যে আগুন এখনো নিভেনি :

ঘটনার পর শহর আবার তার চেনা ছন্দে ফিরেছে। পর্যটকের ভিড় বেড়েছে, ব্যবসা সচল হয়েছে। কিন্তু নিহতদের পরিবারগুলোর কাছে সেই আগুন এখনো নিভেনি। নিহত আবু তাহেরের বাড়িতে গেলে বোঝা যায়, কী ভয়াবহ শূন্যতা নেমে এসেছে। তিনি ছিলেন একজন অটোরিকশাচালক। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর বড় ছেলে মোহাম্মদ সোহেল ইসলাম এখন পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন।

ভারী কণ্ঠে সোহেল বলেন, “বাবা ছিল আমাদের সবকিছু। উনাকে হারিয়ে আমরা একেবারে দিশেহারা হয়ে গেছি।”

তিনি জানান, তার বাবার মৃত্যুর পর ভাড়া বাসা ছেড়ে এখন নানুর বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়েছে। সামনে ঈদ, কিন্তু কোনো প্রস্তুতি নেই। ছোট দুই বোন আর ভাইকে কীভাবে সামলাবো, বুঝতে পারছি না। গত ঈদে বাবা ছিল, আমরা সবাই মিলে বাজার করেছি। আর এবার…। কথা শেষ করতে পারেন না সোহেল।

আবু তাহের রেখে গেছেন দুই ও তিন বছরের দুই কন্যা, সপ্তম শ্রেণির এক ছেলে, কলেজপড়ুয়া সোহেল এবং স্ত্রীকে। পাঁচ সদস্যের এই পরিবার এখন প্রতিদিন অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করছে।

‘তিনটা বাচ্চা নিয়ে কী করবো?’ :

একই ঘটনায় নিহত মোতাহের মিয়ার পরিবারেও নেমে এসেছে একই শূন্যতা। তাঁর স্ত্রী মায়েশা আক্তার মুন্নি বলেন, “আমার স্বামীই ছিল সংসারের একমাত্র ভরসা। চিকিৎসার সময় সব টাকা শেষ হয়ে গেছে। এখন তিনটা ছোট বাচ্চা নিয়ে কী করবো বুঝতে পারছি না।”

তিনি জানান, স্বামীর চিকিৎসার জন্য ধারদেনা করতে হয়েছে। এখন সেই ঋণ শোধ করার উপায়ও নেই। “ঈদ আসছে, কিন্তু আমাদের ঘরে কোনো আনন্দ নাই। বাচ্চাদের নতুন কাপড় কিনে দিতে পারলাম না।” কথাগুলো বলতে বলতে তাঁর চোখ ভিজে ওঠে।

ছোট তিন সন্তানকে নিয়ে প্রতিদিন নতুন করে জীবনযুদ্ধ শুরু করতে হচ্ছে তাঁকে।

ভাঙা ঘর, ভাঙা জীবন :

নিহত আব্দুর রহিমের পরিবারের অবস্থা আরও করুণ। একটি জরাজীর্ণ ঘরে তাদের বসবাস। যেখানে বৃষ্টিতে পানি পড়ে, দেয়ালে ফাটল। সেই ঘরেই এখন জমে আছে শোক আর অনিশ্চয়তা।

পরিবারের সদস্যরা জানান, একদিন পরেই ঈদ, কিন্তু ঘরে নেই কোনো আয়োজন। নেই নতুন কাপড়, নেই খাবারের নিশ্চয়তা। তাদের কাছে ঈদ এখন শুধু একটি তারিখ। যার সঙ্গে কোনো আনন্দ জড়িয়ে নেই।

আগুনের পেছনে অবহেলার অভিযোগ :

এই অগ্নিকাণ্ডকে ঘিরে উঠে এসেছে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ। বিস্ফোরণ অধিদপ্তরের দায়ের করা মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, গ্যাস পাম্পটি চালাতে প্রয়োজনীয় কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি। জেলা প্রশাসনের অনাপত্তিপত্র, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি কিংবা বিস্ফোরক অধিদপ্তরের লাইসেন্স। কোনোটিই ছিল না।

এই ঘটনায় পাম্পের মালিক নুরুল আলম (এন আলম) এর বিরুদ্ধে বিস্ফোরক আইন, এলপিজি বিধিমালা ও দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় মামলা হয়েছে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি এখন জেলে আছে।

এদিকে, ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা জানান, প্রায় ১৪ হাজার লিটার ধারণক্ষম ট্যাংক থেকে গ্যাস লিকেজ হয়েই আগুনের সূত্রপাত। পাম্পটিতে প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও ছিল না।

জনবহুল এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা :

স্থানীয়দের অভিযোগ, জনবহুল আবাসিক এলাকায় এমন একটি গ্যাস পাম্প স্থাপনই ছিল বড় ঝুঁকি। পাম্পটির আশপাশে আদর্শগ্রাম, চন্দ্রিমা হাউজিং ও পুলিশ লাইনস এলাকায় প্রায় ২০ হাজার মানুষের বসবাস। এমন এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ছাড়াই গ্যাস পাম্প চালু হওয়া নিয়ে আগে থেকেই উদ্বেগ ছিল স্থানীয়দের মধ্যে।

পরিবেশকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, যথাযথ অনুমোদন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া এ ধরনের স্থাপনা চালু হওয়া মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।

মানববন্ধন: “বিচার ও ক্ষতিপূরণ চাই” :

দুর্ঘটনার পর কার্যকর সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ তুলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও এলাকাবাসী মানববন্ধন করেছেন। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ক্ষতিগ্রস্ত রশিদ বলেন, “আমাদের আয়ের মানুষ হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। বাড়িতে খাবার নেই। এখনো কোনো সহযোগিতা পাইনি।”

শহিদুল ইসলাম বলেন, “আমরা প্রিয়জন হারিয়েছি, অনেকেই এখনো মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও সুষ্ঠু বিচার চাই।”

মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, গ্যাস পাম্পে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও তদারকির অভাব ছিল। তাঁরা অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানান।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও দগ্ধদের চিকিৎসা ব্যয় বহন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

সাময়িক সহানুভূতি, দীর্ঘ লড়াই :

দুর্ঘটনার পর প্রশাসন ও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে পরিবারগুলোর দাবি, এই সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও তাদের পাশে সে অর্থে কেউ দাঁড়ায়নি। তাদের ভাষায়, “কয়েক দিনের সহানুভূতি দিয়ে জীবন চলে না।”

তাদের প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা, নিয়মিত আয়, বাসস্থানের নিরাপত্তা, সন্তানদের শিক্ষা নিশ্চিত করার সুযোগ।

উৎসবের শহরে অদৃশ্য শোক :

ক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ. এম. নজরুল ইসলাম বলেন, “কক্সবাজার শহর ঈদের আনন্দে ভাসবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কলাতলীর এই পরিবারগুলোর জন্য ঈদ মানে অন্য কিছু। এখানে নেই আলো, নেই আনন্দ। আছে শুধু শূন্যতা, কষ্ট আর হারানোর বেদনা। শহরের উৎসব তাদের ঘরে পৌঁছায় না। তাদের ঈদ নিঃশব্দ, অদৃশ্য।”

স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ‘আমরা কক্সবাজারবাসী’ এর সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দীন বলেন, “কলাতলীর এই তিনটি পরিবারের গল্প শুধু ব্যক্তিগত বেদনার নয়। এটি একটি বড় প্রশ্নও তুলে ধরে। দুর্ঘটনার পর সহানুভূতি কি কেবল কয়েক দিনের জন্য ? নাকি নিশ্চিত করা হবে নিরাপদ স্থাপনা, জবাবদিহি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন।”

তিনি আরও বলেন, “ঈদ আসবে, চলে যাবে। শহর আবার তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে। কিন্তু এই পরিবারগুলোর জীবনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কি কখনো পূরণ হবে ? নাকি নিভে যাওয়া সেই আগুনই তাদের জীবনভর জ্বালিয়ে রাখবে নিঃশব্দে, অদৃশ্য যন্ত্রণায় ?”

সকাল নিউজ/এমএম

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version