নারী দিবসেই পঞ্চগড় জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালকের (অ.দা.) একেএম ওয়াহিদুজ্জামানের কাছে লাঞ্ছিত হওয়ার অভিযোগ করেছেন খোদ তার অফিসের নারী কর্মীরা। গায়ে হাত তোলাসহ নানা অভিযোগ উঠেছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, বদলি আদেশের ৩ মাস পেরিয়ে গেলেও অদৃশ্য ক্ষমতার বলয়ে এখনো চারটি অফিসে রাজত্ব করছেন বিতর্কিত এই কর্মকর্তা। অফিসের আয়োজনে শপথ অনুষ্ঠানে ডিম, বিস্কুল ও কলা খাইয়ে ২০০ প্যাকেট বিরানির বিল করা, ৫ টি চেয়ার কিনে দ্বিগুণ বিল করাসহ নানা অনিয়মে আলোচিত সমালোচিত হন এই ওয়াহিদুজ্জামান।
সবচেয়ে বড় পরিসরে আলোচনায় আসেন আল্লাহ ও হযরত মুহাম্মদ (সা.) কে সরাসরি দাবি করে। তার এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরই মধ্যে নারী দিবসে তার অফিসের নারী কর্মীর গায়ে হাত তুলে নতুন করে আলোচনায় তিনি।
ভুক্তভোগী নারীরা জানান, একেএম ওয়াহিদুজ্জামান ২০২০ সালে বোদা উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা পদে যোগদান করেন। এরপরে ক্রমানয়ে বোদা উপজেলার পাশাপাশি দেবীগঞ্জ ও পঞ্চগড় সদর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা এবং জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালকের পদে অতিরিক্ত পান। চার অফিসের দায়িত্বে থাকায় ওয়াহিদুজ্জামান বনে যান জেলা মহিলা বিষয়ক অফিসের সম্রাট রূপে। চারটি অফিসে গড়ে তোলেন অনিয়ম আর দুর্নীতির রাজত্ব। তার কথা না শুনলেই আক্রোশের মুখে পড়তে হয় অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারীদের।
অফিসের কর্মী থেকে শুরু করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি তার দুর্ব্যবহার থেকে বাদ যায় কেউই। ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর তাকে পঞ্চগড় থেকে চাপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জে বদলি করা হয়। কিন্তু বদলি আদেশের ৩ মাস পেরিয়ে গেলে এখনো অদৃশ্য ক্ষমতার বলে চারটি অফিসেই দিব্যি দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তিনি। এদিকে চার অফিসের রাজত্ব টেকাতে তদবির শুরু করেছেনও তিনি।
অফিসের হিসাবরক্ষক সিলভিয়া নাসরিনের স্বামী ঠাকুরগাঁয়ের বিএনপি নেতা মিজানুর রহমানকে দিয়ে বিএনপি মহাসচিবের কাছে তদবিরের চেষ্টা করেন তিনি। পরে ব্যর্থ হয়ে অফিসের সকল কর্মীদের সাথে দুর্ব্যবহার শুরু করেন ওয়াহিদুজ্জামান।
ভুক্তভোগিরা আরও জানায়, রবিবার নারী দিবসে নারীদের নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যান জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ লুনা বেগম। একটু দেরী হওয়ায় জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের দোতলায় নারীদের গালিগালাজ এমনকি লুনার গায়ে হাত তোলেন ওই কর্মকর্তারা। বিষয়টি তারা নারী দিবসের আলোচনাতেও উত্থাপন করন। এমনকি জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ করেন। পরে তারা নিজ কার্যালয়ে প্রতিবাদ করলে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে।
ভুক্তভোগী প্রশিক্ষক লুনা বেগম বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন এই কর্মকর্তার দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছি। অসভ্য ভাষায় আমাদের গালিগালাজ করেন তিনি। তারপরও জীবিকার জন্য নিরবে সব সহ্য করেছি। আজ নারী দিবসে সবার সামনে তিনি আমার গায়ে হাত তুলেছেন। সকল নারী কর্মীদের অসভ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছেন। এটা মেনে নেয়া যায় না।’
ওই অফিসের হিসাবরক্ষক সিলভিয়া নাসরিন বলেন, ‘তিনি আমার স্বামীর মাধ্যমে বিএনপি মহাসচিবকে বলে বদলি ঠেকাতে প্রস্তাব দেন। কিন্তু আমার স্বামী সেই কাজ না করায় আমাকে কোন কারণ ছাড়াই গালিগালাজ শুরু করেন তিনি। প্রতিদিন অফিসে এসে দুর্ব্যবহার করেন। তার জিহ্বায় ঘা হয়েছে সেখানে আমাকে মলম লাগিয়ে দিতে বলেন। আমরা এই অফিসার থেকে মুক্তি চাই। হয় আমাদের অন্যত্র বদলি করে দিন। না হলে এই অফিসার থেকে আমাদের রক্ষা করুন।’
ওই অফিসের ঝাড়ুদার সালমা বেগম বলেন, ‘আমরা ছোট পদে চাকরি করে অল্পটাকা বেতন পাই। কিন্তু ওই অফিসার আমাদের সাথে যে ব্যবহার করেন তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। কিছু হলেই লাথি দিতে এগিয়ে আসেন। এর আগে আমাকে লাথিও মেরেছেন।’
ওই অফিসের কর্মচারী বৃদ্ধ মকবুল হোসেন বলেন, ‘আমাকে সময় মতো নামাজে যেতেও বাধা দেন এই অফিসার। কায়েকবার আমার গায়ে গাত তোলেন তিনি।’
পঞ্চগড়ের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক সুমন চন্দ্র দাশ বলেন, ‘ভুক্তভোগী নারীরা আমাকে অভিযোগ করেছে। আমরা বিষয়টি তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছি।’
এদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক (অ. দা.) একেএম ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, সব মিথ্যে। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।
সকাল নিউজ/এসএফ


