ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কক্সবাজারের উন্নয়ন, প্রতিনিধিত্ব ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে একটি নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) সকালে কক্সবাজার শহরের ওয়াশ কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত এ সংলাপের আয়োজন করে জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল (জেসিআই) কক্সবাজার এবং কক্সবাজার কমিউনিটি অ্যালায়েন্স, ঢাকা (সিসিএডি) ও গবেষণা সহযোগী হিসেবে ছিলো বে ইনসাইট।
‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: কেমন কক্সবাজার চাই আমরা’—শীর্ষক এই সংলাপে স্থানীয় উন্নয়ন, পর্যটন, পরিবেশ, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারী ক্ষমতায়ন ও রাজনৈতিক জবাবদিহি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়।
সংলাপে বক্তারা বলেন, ‘কক্সবাজারে একের পর এক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও স্থানীয় মানুষের জীবনে তার বাস্তব সুফল এখনও স্পষ্ট নয়।’
জেসিআই কক্সবাজারের সভাপতি মনোয়ার জিসান বলেন, ‘কক্সবাজারে বড় বড় প্রকল্প হচ্ছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই উন্নয়ন কার জন্য? স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান, জীবনমান ও নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, সেটাই বড় প্রশ্ন। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশীদার না করলে সেই উন্নয়ন টেকসই হবে না।’
পর্যটন খাতের প্রসঙ্গে বক্তারা বলেন, ‘দেশের প্রধান পর্যটন নগরী হলেও এই খাত থেকে স্থানীয় উদ্যোক্তা ও শ্রমজীবীরা কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাচ্ছেন না।’
পর্যটন ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান মিল্কী বলেন, ‘পর্যটনে বিনিয়োগ বাড়ছে, কিন্তু স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। এই বৈষম্য দূর না হলে পর্যটন কখনো টেকসই হবে না।’
রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সহ-সভাপতি রিয়াজ মোহাম্মদ শাকিল বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সমুদ্রকেন্দ্রিক পর্যটন পরিবেশবান্ধবভাবে পরিচালিত হলেও কক্সবাজারে অনেক ক্ষেত্রেই তা বন্ধ বা সীমিত করা হয়েছে।’
সীমান্ত পরিস্থিতি, মাদক, মানবপাচার ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে মানুষ উন্নয়নের ওপর আস্থা পায় না। বসবাস নিরাপদ না হলে পর্যটন কিংবা বিনিয়োগ—কোনোটাই টেকসই হবে না।’
সংলাপে পরিবেশগত ঝুঁকি ও অপরিকল্পিত নগরায়ন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এসময় এডভোকেট মো. জাহাঙ্গীর বলেন, ‘পাহাড় কাটা, বনভূমি দখল ও উপকূলীয় পরিবেশ ধ্বংস কক্সবাজারের দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্বের জন্য হুমকি।’
সিসিএডির মূখ্য সমন্বয়ক মোহিব্বুল মোক্তাদির তানিম বলেন, ‘আমাদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের সমন্বয় না থাকলে ভবিষ্যতে কক্সবাজার বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের পর জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে নাগরিকদের সংযোগ থাকে না। এই সংস্কৃতি বদলাতে হবে।’
এনসিপির সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক বলেন, ‘মাদক, রোহিঙ্গা সংকট ও মানবপাচার—এই তিনটি বিষয় পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। সীমান্ত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন এবং উখিয়া–টেকনাফকে বিশেষ অঞ্চল ঘোষণার প্রয়োজন রয়েছে।’
বক্তারা বলেন, নির্বাচনের সময় শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব প্রয়োজন।
জামায়াতে ইসলামীর কক্সবাজার জেলা সেক্রেটারি জাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘদিন জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব না থাকায় সমস্যাগুলো একই রয়ে গেছে। সৎ ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব নির্বাচন করতে পারলে পরিবর্তন সম্ভব।’
কক্সবাজার উইমেন চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি জাহানারা ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে একই প্রশ্ন- কেমন কক্সবাজার চাই। এর মানে আমরা এগুচ্ছি না। প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন ও নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে।’
শিক্ষার্থী আফিফা উলফা বলেন, ‘একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি নারীদের জন্য কারিগরি শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো জরুরি।’
অধিকারকর্মী হাসনা হুরাইন বলেন, ‘স্বাস্থ্যখাত এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে, অথচ যারা কাজ করতে চান তাদের নিরুৎসাহিত করা হয়।’
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সহসভাপতি শেখ আশিকুজ্জামান বলেন, ‘টেকনাফ স্থলবন্দর তিন বছর ধরে বন্ধ। মিয়ানমারে প্রায় ৯০ লাখ ডলার আটকে আছে। দ্রুত স্থলবন্দর চালু ও চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক চার লেন বাস্তবায়ন প্রয়োজন।’
ব্যবসায়ী আশরাফুল হুদা সিদ্দিকী জামসেদ বলেন, ‘লবণ শিল্প ধ্বংসের মুখে এবং স্থানীয় চাষিদের রক্ষায় সরকারের কার্যকর উদ্যোগ দরকার।’
আয়োজকরা জানান, এই নাগরিক সংলাপ কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি জনস্বার্থ ও নাগরিক ভাবনার জায়গা।
সংগঠক হেদায়েত আজিজ মিঠু বলেন, ‘আমরা চাই তরুণদের নেতৃত্ব ও নাগরিক কণ্ঠস্বর নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হোক।’
আলোচনায় উঠে আসা মতামত ও সুপারিশ লিখিত আকারে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল ও নীতিনির্ধারকদের কাছে পাঠানো হবে বলে জানান আয়োজকরা।
সকাল নিউজ/এসএফ


