২৪-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোটে যোগ দেওয়ায় বেশ টানাপোড়েনে পড়েছে। এই ইস্যুতে এরইমধ্যে পদত্যাগ করেছেন দলটির শীর্ষ কয়েকজন নেতা। জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিষয়ে দ্বিমত পোষণের পাল্লা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পদত্যাগকারী একাধিক নেতা জানিয়েছেন, গণঅভ্যুত্থানের রাজনীতি থেকে সরে আসায় এবং ‘জামায়াত ট্যাগ’ এড়াতে দল ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন তারা। নির্বাচন, গণভোট ও সংস্কারের প্রশ্নে দলটির নেতারা বিগত দিনগুলোতে এক থাকলেও নতুন বছরে আদর্শিক দ্বন্দে বিভক্ত হচ্ছে দলটির নেতারা।

তবে এসবের পরও এনসিপির নেতারা আশায় রয়েছেন এই টানাপোড়েন তারা কাটিয়ে উঠবেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে গত ৭ ডিসেম্বর এনসিপি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন মিলে নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’ গঠন করেছিল। সেই জোট ঘোষণার মাস না যেতেই গত ২৮ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন আট রাজনৈতিক দলের জোটে যোগ দেয় এনসিপি। তখন থেকেই এনসিপির ভেতরে টানাপোড়েন শুরু হয়।

এই জোটে এনসিপি যোগ দেওয়ার পর দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম গণমাধ্যমে বলেন, ‘হাদির খুনের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয় বাংলাদেশে এখনও আধিপত্যবাদী শক্তি রয়েছে। ৫ আগস্ট যে স্বৈরাচারকে তাড়িয়েছি তারা নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে। সেজন্য বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে আমরা জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতায় এসেছি। এনসিপি নির্বাচনের প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে। এই নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করার জন্য আমরা জামায়াতে ইসলামী ও সমমনা দলের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতায় পৌঁছেছি। আমরা একসঙ্গে নির্বাচনে অংশ নেবো।’

নাহিদ ইসলাম ‘নির্বাচনী সমঝোতা’ বললেও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান অবশ্য বলেন এটি রাজনৈতিক জোট। জোট গঠন হওয়ার পর তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘জোট বলুন আর না বলুন, আমরা কিন্তু জোটের চাইতেও আরও মজবুত, আরও ঐক্যবদ্ধ। এটা নিয়ে আমরা আগাব। এটা দেশ গঠনের জোট, এটা নির্বাচনের জোট, এটা রাজনৈতিক জোট, এটা সকল ধরনের.. ওই জোট বলেন আর সমঝোতা বলেন, যাই বলেন, এটা সবগুলো পারপাস সার্ভ করার জন্য। দলীয় কর্মসূচি যার যার অনেকগুলা থাকবে, তারপরে ন্যাশনাল ইস্যুতে যেখানেই প্রয়োজন আমরা একসাথে করব।’

দলীয় সূত্রে জানা যায়, জামায়াতের জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে তীব্র আপত্তি ছিল এনসিপির ৩০ জন কেন্দ্রীয় সদস্যের। তারা দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে চিঠি দিয়ে উদ্বেগ ও আপত্তি জানান। চিঠিতে এনসিপির আদর্শ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দায়বদ্ধতা ও গণতান্ত্রিক নৈতিকতাকে আপত্তির ভিত্তি বলা হয়। ১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকা, বিভাজনমূলক কর্মকাণ্ড, গুপ্তচরবৃত্তি ও এনসিপির নারী সদস্যদের চরিত্র হননের চেষ্টা এবং সামাজিক ফ্যাসিবাদ উত্থানের আশঙ্কার কথা চিঠিতে তুলে ধরেন নেতারা।

দলটি থেকে পদত্যাগকারী একাধিক নেতা জানান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিতর্কিত ও লজ্জাজনক অধ্যায়। সেই সময় তারা স্বাধীনতার প্রশ্নে জাতির বিপক্ষে অবস্থান নেয়। এই ভূমিকা শুধু স্বাধীনতার সংগ্রামকে বাধাগ্রস্ত করেনি বরং জাতির ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করে। ফলে আমরা কোনোভাবেই জামায়াতের সাথে নির্বাচনী জোটে যেতে পারি না। আমরা গণঅভ্যুত্থান করেছি জামায়াতের সঙ্গে জোট করার জন্য নয়। আমরা এনসিপির নিজস্ব আদর্শে বড় হতে চেয়েছিলাম।

তারা বলেন, ‘দল ক্ষমতার লোভে আদর্শচ্যুত হয়ে জোটে অংশ নিচ্ছে। আমরা এ কারণে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটি কোনো ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয় বরং নৈতিক অবস্থান থেকে নেওয়া একটি সচেতন সিদ্ধান্ত। আদর্শহীন বিভাজন, ইতিহাসবিরোধী অবস্থান এবং নারী সহকর্মীদের প্রতি অসম্মানজনক আচরণের সঙ্গে আপস করা সম্ভব নয়। ন্যায়, সম্মান ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রশ্নে এই পদত্যাগ একটি স্পষ্ট বার্তা।’

জামায়াতের সঙ্গে জোটের কারণে এখন পর্যন্ত প্রায় ডজন খানেক নেতা এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব পদে থাকা ডা. তাসনিম জারা। তবে, এখনো দলের সঙ্গে থাকা এনসিপির অন্য কেন্দ্রীয় নেতারা মনে করছেন বিষয়টাতে তাড়াহুড়ো করছেন পদত্যাগী নেতারা। নতুন দল হিসেবে তারা চাইলে বিষয়গুলো ঠিক করার জন্য আরেকটু সময় দিতে পারতেন। নিজেরা আরেকটু রয়ে সয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। যেমনটা সামান্তা শারমিন করেছেন।

এ ছাড়া তাসনিম জারার স্বামী খালেদ সাইফুল্লাহ, দলটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও মিডিয়া সেলের প্রধান মুশফিক উস সালেহীন, কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন ও যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীনও পদত্যাগ করেছেন।

অবশ্য, তাসনিম জারার পদত্যাগের পর অবশ্য দলে যুক্ত হয়েছেন জুলাই আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পদে থাকা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূইয়া। পাশাপাশি নাহিদ-হাসনাত-মাসুদসহ গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারিতে থাকা এনসিপির শীর্ষ নেতারা কেউ দল থেকে পদত্যাগ করেননি। তারা সবাই দলে আছেন এবং নির্বাচনী কার্যক্রমে ব্যস্ত আছেন।

দলীয় নেতৃত্বে টানাপোড়েনের পরও সামনের নির্বাচনে দল হিসেবে ভালোকিছু করা এবং নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে এনসিপি। দলে বর্তমানে সক্রিয় একাধিক নেতা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

সকাল নিউজ/এসএফ

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version