অসংখ্য-অগণিত নেতা-কর্মী ও সমর্থক-শুভাকাঙ্খীদের শোকের সাগরে ভাসিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর মৃত্যুতে দেশজুড়ে নেমে এসেছে শোকের মাতম। রাজনীতিতে দেখা দিয়েছে অপূরণীয় শূণ্যতা।
বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকার প্রধান। একনায়কতন্ত্র, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের প্রশ্নে তিনি ছিলেন ‘আপসহীন’।
জন্ম: ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট অবিভক্ত ভারত উপমহাদেশের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুঁড়ির নয়াবস্তি এলাকায় বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম। বিএনপির সূত্র ও তার জীবনীগ্রন্থগুলো থেকে জানা যায়, খালেদা জিয়ার পারিবারিক নাম খালেদা খানম পুতুল। পারিবারিকভাবে তার আরও ডাকনাম ছিল- টিপসি, শান্তি। বাবা ইস্কান্দর মজুমদারের বন্ধু চিকিৎসক অবনীগুহ নিয়োগীই সদ্য প্রসূত কন্যাকে ‘শান্তি’ নামে সম্মোধন করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে মাত্র কয়েকদিনে পড়েছে। দিনকয়েক আগে জাপানে ঘটে গেছে আমেরিকার আনবিক বোমার হত্যাযজ্ঞ। ভারতসহ নানা দিকেই তখন শান্তি মিছিল, মানুষের এই আকাঙ্ক্ষার মধ্যেই নতুন জন্ম নেওয়া শিশুকন্যার নাম হয়ে উঠলো ‘শান্তি’। পরবর্তী সময়ে মেঝো বোন সেলিনা ইসলামের রাখা ‘পুতুল’ নামটিই জড়িয়ে গেল খালেদা জিয়ার ডাকনাম হিসেবে।
শৈশব ও শিক্ষা জীবন: খালেদা জিয়ার জন্মের পর প্রথম দুইবছর কাটে জলপাইগুড়িতে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান একটি স্বাধীন দেশ হলে তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার দিনাজপুরে চলে আসেন। সেখান স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সেখানেই তার শৈশব ও শিক্ষা জীবন কাটে। পাঁচ বছর বয়সে খালেদা খানম পুতুলকে তার বাবা দিনাজপুরের সেন্ট জোসেফ কনভেন্টে ভর্তি করান। সেখানে খালেদা জিয়া প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে তিনি দিনাজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ভর্তি হন। ১৯৬৩ সালে এ কলেজ থেকে খালেদা জিয়া ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
পারিবারিক জীবন: খালেদা জিয়ার আদিবাড়ি ফেনীর ফুলগাজী উপজেলায়। তার বাবার নাম ইস্কান্দর মজুমদার ও মা বেগম তৈয়বা মজুমদার। তিন বোন (খুরশিদ জাহান হক চকলেট, সেলিনা ইসলাম বিউটি ও খালেদা খানম পুতুল) ও দুই ভাইয়ের (মেজর সাঈদ ইস্কান্দর ও শামীম ইস্কান্দর) মধ্যে খালেদা জিয়া তৃতীয়। এদের মধ্যে এক বোন সেলিনা রহমান, ভাই শামীম ইস্কান্দর জীবিত আছেন।
দাম্পত্য জীবন: ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট দিনাজপুরের মুদিপাড়ায় পিত্রালয়ে সেনাবাহিনীর তরুণ ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে খালেদা খানম পুতুলের বিয়ে হয়। জিয়া ও খালেদা প্রথম চার বছরের দাম্পত্য জীবন দিনাজপুরে কাটিয়েছিলেন। খালেদা জিয়া বিয়ের পর জিয়াউর রহমানের গ্রামের বাড়ি বগুড়ার বাগবাড়িতেও থেকেছেন। বিয়ের পর তিনি স্বামীর কর্মক্ষেত্রের কারণে বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করেন।
জিয়াউর রহমানের পোস্টিং পাকিস্তান হওয়ায় ১৯৬৫ সালে খালেদা জিয়া স্বামীর সাথে সেখানে বসবাস করেন। তাঁদের দুই পুত্র। বড়ো সন্তান তারেক রহমান, তাঁর জন্ম ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর, যিনি বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। ছোট সন্তান আরাফাত রহমান কোকো ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন।
মুক্তিযুদ্ধকাল: ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান থেকে মেজর জিয়া ঢাকায় ফিরে আসেন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরুতে মেজর জিয়াকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে স্থানান্তর করা হয়। জিয়া পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আগ্রাসী দমননীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিতে নিজের পরিবারকে অরক্ষিত অবস্থায় রেখে জিয়াকে এগিয়ে যেতে হয়। যুদ্ধের প্রায় প্রথম দুই মাস খালেদা জিয়া সন্তানদের নিয়ে চট্টগ্রামে আত্মগোপনে ছিলেন। তিনি ঢাকায় এসে স্বজন ও পরিচিতজনদের বাসায় আত্মগোপনে থাকেন। এ অবস্থায় ১৯৭১ সালের ২ জুলাই সিদ্ধেশ্বরীর একটি বাসা থেকে খালেদা জিয়াকে আটক করা হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকা হানাদারমুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়া সেনা হেফাজতে ছিলেন।
জিয়ার মৃত্যু: ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাত দশটায় জিয়া চট্টগ্রাম থেকে বাসায় খালেদা জিয়াকে ফোন করেছিলেন। বলেছিলেন কাল আসবেন। চট্টগ্রামে ভালো আছেন। কিন্তু সেটাই ছিল খালেদা জিয়ার কাছে জিয়ার জীবনের শেষ ফোন। চক্রান্তকারীরা জিয়াকে মর্মান্তিকভাবে হত্যা করে। সেই সঙ্গে দীর্ঘ একুশ বছরের তাদের মধুর দাম্পত্য জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।
রাজনৈতিক জীবন শুরু: ১৯৮১ সালের ৩০ মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে যখন হত্যা করা হয়, বেগম খালেদা জিয়া তখন নিতান্তই একজন গৃহবধূ। রাজনীতি নিয়ে চিন্তাভাবনা তো দূরের কথা, রাজনৈতিক কোন অনুষ্ঠানেও তাকে খুব একটা দেখা যেতো না। প্রেসিডেন্ট জিয়ার মৃত্যুর পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক ফরমান জারি করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। বিচারপতি সাত্তারকে অপসারণ করেন। একদিকে দলীয় কোন্দল, অন্যদিকে বিএনপির অনেক নেতার এরশাদের মন্ত্রিসভায় যোগদান – এই দুই পরিস্থিতিতে বিএনপি তখন অনেকটা ছত্রভঙ্গ, বিপর্যস্ত এবং দিশেহারা। এরশাদ বিএনপির অভ্যন্তরে ভাঙন ধরানোর জন্য একের পর এক প্রচেষ্টা চালান। তখন অনেকটা আকস্মিকভাবেই রাজনীতিতে এলেন বেগম খালেদা জিয়া। বিএনপির নেতাদের পরামর্শ ও অনুরোধে বেগম খালেদা জিয়া ১৯৮২ সালে বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ১৯৮৩ সালে ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন।
আন্দোলন ও নেতৃত্ব: বেগম খালেদা জিয়া দলে দায়িত্ব নিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৮৩ সালে গঠিত সাতদলীয় জোটের নেতৃত্ব দেন তিনি। ১৯৮৬ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়ার কঠোর সিদ্ধান্ত এবং এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে তাকে ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত কয়েকবার আটক করে তৎকালীন স্বৈরাচার সরকার। বেগম খালেদা জিয়ার দূরদর্শি নেতৃত্ব গণআন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে।
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদের পতনে তাঁর নেতৃত্ব ছিল অবিস্মরণীয়। দীর্ঘ আন্দোলনে গণতন্ত্র প্রশ্নে লড়াই সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়া ‘আপসহীন’ নেত্রীর খ্যাতি লাভ করেন। একনায়কতন্ত্র, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তার জোরালো অবস্থান ছিল অতুলনীয়।
বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম নির্বাচন: এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবকটিতে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন বেগম খালেদা জিয়া। সে নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
নির্বাচনে অংশগ্রহণ: নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে প্রথম মেয়াদে (১৯৯১-৯৫) সরকার গঠন করে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকার প্রধান হন বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৯১ সালের ১৯ মার্চ বেগম খালেদা জিয়া পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। তাঁর সরকার দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠা করে।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন বেগম খালেদা জিয়া। স্বল্প সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাস করে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন তিনি। ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাস হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও এককভাবে ১১৬টি আসন পেয়ে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিরোধী দলের মর্যাদা লাভ করে। সে নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়া দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঁচটি আসন থেকে বিজয়ী হন।
বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৯৯৯ সালে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি ও ইসলামী ঐক্যজোট নিয়ে চারদলীয় জোট গঠিত হয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের অগণতান্ত্রিক ও অপশাসন কার্যক্রমের বিরুদ্ধে জোটভিত্তিক আন্দোলন ও কর্মসূচি পালন করে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে এই জোট।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সে নির্বাচনে বিএনপি’র নেতৃত্বে চারদলীয় জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন বেগম খালেদা জিয়া। সে নির্বাচনেও তিনি ৫টি আসনে নির্বাচন করে নির্বাচিত হন। এ সময়ে নারী শিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক সংস্কারে তাঁর সরকার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও আলোচিত এক-এগারো: সংবিধান অনুযায়ী ২০০৬ সালের নভেম্বরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন বেগম খালেদা জিয়া। ওই সরকার ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করে তফসিল ঘোষণা করেছিল। সকল রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র দাখিল করে। একপর্যায়ে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর সমর্থনে ক্ষমতায় আসে ফখরুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার।
তাদের নানা কর্মকাণ্ড বিশেষ করে রাজনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার তৎপরতা তখন দৃশ্যমান হয়েছিল। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর বেগম খালেদা জিয়া ও তাঁর ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে ২০০৭ সালের ৭ মার্চ বেগম খালেদা জিয়ার জেষ্ঠ্যপুত্র ও বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান গ্রেফতার হন।
বেগম খালেদা জিয়াকে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মুক্তি দেয়া হয়। তারেক রহমানকে মুক্তি দেয়া হয় ৩ সেপ্টেম্বর। গ্রেফতারের পর যৌথবাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হন তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো। কারামুক্তির পর তারেক রহমানকে চিকিৎসার জন্য লন্ডন ও আরাফাত রহমান কোকোকে থাইল্যান্ড পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে আরাফাত রহমান কোকো মালয়েশিয়ায় থাকতেন। সেখানে অসুস্থ হয়ে ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন: সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নানা সংকটের মাঝেই বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে অংশ নেয় বিএনপি। এ নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে এবং বিএনপি বিরোধী দল হয়। ২০১১ সালের ৩০ মে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। এর বিরুদ্ধে বিএনপির নেতৃত্বে ১৮ দলীয় জোট আন্দোলন করে।
ওই অবস্থায় বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের বর্জনের মধ্য দিয়ে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেখ হাসিনার অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জোট মনোনীত ১৫৩ জন সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ভোটারবিহীন ওই নির্বাচন ছিলো দেশের রাজনীতিতে একটি কলঙ্কিত অধ্যায়।
এর মধ্যে বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান, আরাফাত রহমান কোকো, তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানসহ জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু করে হাসিনা সরকার। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত করে খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। কারাবন্দী হওয়ার পর তিনি নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
বেগম খালেদা জিয়া কিডনি, লিভার জনিত, ডায়াবেটিস, আর্থাইটিসসহ নানা রোগে আক্রান্ত হন। কারা হেফাজতে পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় করোনা ভাইরাস মহামারী সংক্রমণের মুখে তাঁকে নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ মুক্তি দেয়া হয়। বিএনপিসহ অনেকের অভিযোগ খালেদা জিয়াকে পরিকল্পিতভাবে অসুস্থতার মুখে ঠেলে দেয়া হয়।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট অংশ নিয়েছিল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে এমন আশ্বাস দিয়েছিলেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ভোটগ্রহণের আগের রাতেই বাক্সে ব্যালট ভরে রেখেছিল আওয়ামী নিয়ন্ত্রিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টরা। এ নির্বাচনও ইতিহাসের একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
আন্দোলন ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন: তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট আন্দোলন কর্মসূচি অব্যাহত রাখে। এরই মধ্যে সকল বিরোধী দলকে বাইরে রেখে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি শেখ হাসিনা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করেন। নির্বাচনটি আমি- ডামির নির্বাচন হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
আওয়ামী লীগ মনোনীত ও আওয়ামী দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থীরাই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। এরূপ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড থেকে সমর্থন ছিল। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি’র শীর্ষ নেতৃত্বসহ কয়েক হাজার নেতাকর্মীকে কারাবন্দী করা হয়।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ও খালেদা জিয়ার মুক্তি: কোটা সংস্কারকে কেন্দ্র করে উচ্চ আদালতের এক রায়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিবাদ জানায় দেশের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এই আন্দোলন কোটা সংস্কার আন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলন দমন করতে গিয়ে ২৪ এর ১৬ জুলাই রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ আরও কয়েকজন হত্যার শিকার হয়। আন্দোলন রূপ নেয় প্রবল গণঅভ্যুত্থানে।
একপর্যায়ে চব্বিশের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। এর মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে। শেখ হাসিনার সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিতর্কিত অনেক কর্মকর্তা ৫ আগস্ট-এর আগে ও পরে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। পরে দেশেও অনেকে গ্রেফতার হন। হাসিনার দীর্ঘ এ শাসনকালে কখনো মাথানত করেননি বেগম খালেদা জিয়া। তিনি গণতন্ত্র, সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ছিলেন অবিচল ও আপসহীন।
২০২৫-এর ৮ জানুয়ারি উন্নত চিকিৎসার জন্য বেগম জিয়াকে লন্ডনে নেওয়া হয়। ১১৭ দিন লন্ডনে অবস্থান শেষে অনেকটা সুস্থ হয়ে গত ৬ মে তিনি দেশে ফিরেন। প্রায় ৮০ বছর বয়সী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে লিভার সিরোসিস, কিডনি জটিলতা, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিসসহ নানা শারীরিক অসুস্থতায় দুর্বল হয়ে পড়েন।
গত ২৩ নভেম্বর রাতে অসুস্থ হয়ে পড়লে বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
সকাল নিউজ/এসএফ

