কলকাতার ঐতিহাসিক মেয়ো রোড বৃহস্পতিবার বিকেলে পরিণত হয়েছিল তরুণদের উত্তাল জনসমুদ্রে। তৃণমূল কংগ্রেসের ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এ সমাবেশে দলের সর্বোচ্চ নেত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি নিশানা করেন ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতৃত্বকে। বক্তব্যে উঠে আসে মানুষের অধিকার, ভোটাধিকার থেকে শুরু করে দুর্নীতি ও পরিবারতন্ত্রের মতো স্পর্শকাতর ইস্যু।
মমতা বলেন, ‘আপনারা মানুষের অধিকার কেড়ে নেন। বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে গরিব মানুষগুলোর ওপর অত্যাচার করেন। গরিব মানুষ আমার হৃদয়, তাদের ভালোবাসি। আমি জাতপাত মানি না।’
বিজেপি নেতারা কথায় কথায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও বাস্তবে তাদের রাজ্যগুলো দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর। তার ভাষায়, ‘মোদিজি সারাক্ষণ দুর্নীতি বলে চিৎকার করেন। অথচ যেখানে যেখানে বিজেপি ক্ষমতায়, সেখানেই গুজরাট মডেলের নামে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। আমরা বাংলায় মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করি, আর ওরা অধিকার কেড়ে নেয়।’
সভায় তিনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকেও কটাক্ষ করেন। মমতা বলেন, ‘আপনারা পরিবারতন্ত্র করেন না! অথচ আপনার ছেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থার প্রেসিডেন্ট। রাজনীতি থেকে আয় নেই, কিন্তু ক্রিকেট থেকে হাজার কোটি টাকা আয় হচ্ছে। রাজনীতিতে না থেকেও সর্বত্র আপনাদের পরিবারের ছড়াছড়ি। মানুষকে ললিপপ দিয়ে ভুলিয়ে রাখছেন, অথচ আমরা অধিকার দিই।’
এনআরসি প্রসঙ্গে মমতার অবস্থান স্পষ্ট- ‘আমার জীবন থাকতে একজনের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে দেব না। বিনা যুদ্ধে বাংলা এক ইঞ্চিও ছাড়েনি, ছাড়বও না।’ তিনি ছাত্রদের সতর্ক করে দেন যেন সবাই নিজেদের ভোটার তালিকা যাচাই করে নেয় এবং আধার কার্ড হালনাগাদ রাখে। কারণ, তার দাবি অনুযায়ী, অন্যের তথ্য ব্যবহার করে বিজেপি ভোট কেটে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
মমতার এই তীব্র অবস্থান এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে ভোটার তালিকা কারচুপির অভিযোগে তুমুল বিতর্ক চলছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছেন, বিপুল সংখ্যক সংখ্যালঘু ও দলিত ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে ভারতের নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বিরোধীদের কার্যত মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছে।
রাহুল গান্ধীর অভিযোগকে ‘সংবিধানের অবমাননা’ বলে খারিজ করেছে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু বিরোধীরা বলছেন, গণতন্ত্রের মৌল ভিত্তি ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে। এবার কংগ্রেস ছাড়াও ইন্ডিয়া জোটের শরিক দলগুলোও একই দাবিতে সরব হচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কলকাতার এ সমাবেশে মমতার ভাষণ শুধু ছাত্রসমাজের উদ্দেশে দেওয়া বার্তা নয়, বরং জাতীয় রাজনীতির জন্যও এক ধরনের ইঙ্গিত। তিনি বোঝাতে চাইছেন- বাংলা এখনও কেন্দ্রীয় ক্ষমতার চাপের কাছে মাথা নত করবে না। গরিব মানুষের অধিকার রক্ষায় তৃণমূল শেষ পর্যন্ত লড়বে।
সমাবেশ শেষে ছাত্রছাত্রীদের উচ্ছ্বাস আর স্লোগান ছিল স্পষ্ট- মমতার এ হুঁশিয়ারি হয়তো ভোটের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে করেন অনেকে। তবে ভারতীয় রাজনীতিতে ভোটাধিকার ইস্যু কীভাবে গতি পায়, সেদিকেই এখন সবার নজর।
সকাল নিউজ/এসএফ


