উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা কুড়িগ্রামের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের মানুষের কাছে পবিত্র রমজান মাসও যেন সংগ্রামের আরেক নাম। শহরের মতো বাহারি ইফতার সামগ্রী তাদের ভাগ্যে খুব একটা জোটে না। অধিকাংশ দিনই চালভাজা, মুড়ি, পান্তা ভাত কিংবা কখনো শুধু পানি দিয়েই ইফতার করতে হয় তাদের। দারিদ্র্য, বন্যা ও নদীভাঙনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে বেঁচে থাকা এসব মানুষের জন্য পুষ্টিকর খাবার দিয়ে ইফতার করা যেন এক প্রকার বিলাসিতা।
কুড়িগ্রাম জেলায় দুধকুমার, ধরলা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্রসহ মোট ১৬টি নদ-নদীর অববাহিকায় গড়ে উঠেছে চার শতাধিক চরাঞ্চল। এসব চরে প্রায় ৮ লাখ মানুষের বসবাস। জেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় ২৪ লাখের মধ্যে একটি বড় অংশই বসবাস করে এসব দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত চর এলাকায়।
প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই বন্যা ও নদীভাঙনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এসব চরাঞ্চল। নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় বসতভিটা, আবাদি জমি ও গবাদিপশু। ফলে অনেক পরিবার রাতারাতি নিঃস্ব হয়ে পড়ে। নদীভাঙনের শিকার হয়ে এক চর থেকে আরেক চরে গিয়ে নতুন করে বসতি গড়ে তোলাই যেন তাদের জীবনের অনিবার্য বাস্তবতা।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর, নাগেশ্বরী উপজেলার কালিগঞ্জ ইউনিয়নের নামারচর, কচাকাটা ইউনিয়নের ইসলামপুর, ভুরুঙ্গামারীর সালমারার চর, রায়গঞ্জ ইউনিয়নের চর দামালগ্রাম, ফান্দের চর, নুচনি চরসহ জেলার প্রায় চার শতাধিক চরাঞ্চলে বসবাসকারী অধিকাংশ পরিবারই প্রতিদিনের ইফতারে চালভাজা, মুড়ি, পান্তা ভাত কিংবা সিদ্ধ আলুর মতো সাধারণ খাবারের ওপর নির্ভরশীল।
চরাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষের প্রধান পেশা কৃষিকাজ ও দিনমজুরি। তবে নদীভাঙন, বন্যা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে স্থায়ী আয়ের কোনো নিশ্চয়তা নেই। অনেক সময় দিনের কাজ না পেলে পরিবার নিয়ে অনাহারে থাকতে হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে তারা নানা নাগরিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত।
রমজান মাসে যখন শহরের মানুষ ফলমূল, ছোলা, বুট, বুন্দিয়া, জিলাপি কিংবা বিরিয়ানিসহ নানা খাবারে ইফতার সাজায়, তখন চরের মানুষের কাছে এসব কেবল স্বপ্নই হয়ে থাকে। অনেক সময় তাদের ইফতারে থাকে পান্তা ভাত, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ মাখা ভাত, চালভাজা, মুড়ি কিংবা সিদ্ধ আলু। আবার কোনো কোনো দিন শুধুমাত্র পানি দিয়েই ইফতার সারতে হয়।
চরাঞ্চলের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা দিনমজুর মানুষ। সারাদিন কাজ করি, যা পাই তাই দিয়ে সংসার চালাই। রমজান মাসে ইফতারে ফল বা অন্য ভালো কিছু খাওয়ার সুযোগ খুব কমই হয়। বেশিরভাগ দিনই চালভাজা বা মুড়ি দিয়েই ইফতার করতে হয়। অনেক সময় বাচ্চারা ভালো কিছু খেতে চায়, কিন্তু আমাদের সামর্থ্য থাকে না। তখন খুব কষ্ট লাগে।’
দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেক সময় বাজার থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সহজলভ্য খাবার দিয়েই তাদের ইফতার করতে হয়, বলে জানান স্থানীয়রা।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নাগেশ্বরী ব্লাড ব্যাংকের সভাপতি রাশেদ আহমেদ বলেন, ‘কুড়িগ্রাম জেলার অধিকাংশ চরাঞ্চলের মানুষ স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মৌলিক সেবার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। বিশেষ করে রমজান মাসে অনেক পরিবারকে কষ্ট করে ইফতার ও সেহরি করতে হয়। তাই তাদের কষ্ট কিছুটা লাঘব করতে আমাদের সংগঠন সামর্থ্য অনুযায়ী চরাঞ্চলের মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছে।’
এদিকে আর্ন এন লিভ কুড়িগ্রাম জেলা শাখার প্রেসিডেন্ট তারেক খান মজলিশ তারা বলেন, ‘চরাঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নানা দিক থেকে সুবিধাবঞ্চিত। রমজান মাসে তাদের কষ্ট আরও বেড়ে যায়। তাই আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে সাধ্যমতো তাদের পাশে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা বিশ্বাস করি, সম্মিলিত উদ্যোগই পারে এই প্রান্তিক জনপদের মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে।’
তবে এ বিষয়ে ভিন্ন মত দিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. আনোয়ারুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘চরাঞ্চলের মানুষের অনেক সময় এই ধরনের খাবার দিয়ে ইফতার করাকে একটি সংস্কৃতির অংশ হিসেবেও দেখা যায়। তবে নদীভাঙন রোধ, নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে চরের মানুষের জীবনমান আরও উন্নত হবে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা জরুরি। নদীভাঙন প্রতিরোধ, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে এসব অঞ্চলের মানুষের দারিদ্র্য অনেকটাই কমানো সম্ভব।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সরকার ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগে চরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হবে এবং একদিন তারাও স্বচ্ছলভাবে রমজানের ইফতারসহ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে।
সকাল নিউজ/এসএফ

