নদীভাঙন আর বন্যা, এই দুই দুর্যোগ লালমনিরহাটের মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। উত্তরের সীমান্তঘেরা এই জেলায় বিশেষ করে চরাঞ্চলের মানুষের জীবন প্রতিনিয়ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে।
দারিদ্র্য, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার এই বাস্তবতায় আশার আলো হয়ে কাজ করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণ উন্নয়ন কেন্দ্র।
স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করতে সংস্থাটি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নদীভাঙন প্রতিরোধে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো- চরাঞ্চলে কাঁচা রাস্তা নির্মাণ, নদীর তীর রক্ষায় বাঁশের বান্ডাল স্থাপন এবং পথচারী ও কৃষকদের বিশ্রামের জন্য ছোট পরিসরের অবকাঠামো তৈরি। এসব কাজ ইতোমধ্যে হাজারো মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে।
হাতীবান্ধা উপজেলার সানিয়াজান ইউনিয়নে নির্মিত প্রায় ১২০০ ফুট দীর্ঘ কাঁচা রাস্তা কয়েকটি গ্রামকে মূল লোকালয়ের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই রাস্তা নির্মাণের ফলে দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তিতে থাকা প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার মানুষ এখন সহজেই চলাচল করতে পারছে। চরাঞ্চলের তীব্র রোদ থেকে স্বস্তি দিতে রাস্তার পাশে তৈরি করা হয়েছে ‘শীতল ছায়া’ নামের গোলঘর, যেখানে পথচারী ও কৃষকরা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে পারছেন।
একইসঙ্গে সিন্দুনা এলাকায় নদীর তীরে বাঁশের বান্ডাল পদ্ধতি ব্যবহার করে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ করা হয়েছে। এই প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে নদীর স্রোত নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় তীরে পলি জমছে এবং ধীরে ধীরে তীরের গঠন শক্ত হচ্ছে। এর ফলে নদীভাঙনের ঝুঁকি কমে আসছে এবং তীরবর্তী মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি রক্ষার বিষয়ে নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠছেন।
সানিয়াজান ইউনিয়নের শিক্ষার্থী মিম জানায়, ‘আগে রাস্তা না থাকায় স্কুলে যাওয়া ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। বন্যার সময় যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেত, এমনকি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতেও সমস্যায় পড়তে হতো। এখন রাস্তা হওয়ায় নিয়মিত স্কুলে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে এবং জীবন অনেক সহজ হয়েছে।’
একই এলাকার এক কৃষক জানান, রাস্তার অভাবে আগে ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়া যেত না। বর্তমানে যানবাহন সরাসরি চরে পৌঁছাতে পারায় ফসল বাজারজাত করা সহজ হয়েছে, যা কৃষকদের আয় বাড়াতে সহায়তা করছে।
সিন্দুনা ইউনিয়নের এক বাসিন্দা বলেন, বাঁশের বান্ডাল বসানোর পর নদীর তীরে বালু জমতে শুরু করেছে। এতে নদীভাঙন কমার পাশাপাশি বন্যায় ঘরবাড়ি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কাও আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে।
গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের কর্মকর্তা রবিউল হাসান জানান, ‘কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইড’-এর সহায়তায় এবং ‘জুরিখ ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স’ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে নদীতীর সংরক্ষণের কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি সানিয়াজান ইউনিয়নে রাস্তা নির্মাণ, রাস্তার দুই পাশে বৃক্ষরোপণ এবং বিশ্রামকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে।
যদিও এসব উদ্যোগে স্থানীয় মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে, তবুও একটি গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা এখনো রয়ে গেছে। নবনির্মিত রাস্তাটিতে দুটি ব্রিজ বা কালভার্ট নির্মাণ করা হলে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে। এ বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার জন্য স্থানীয়দের পক্ষ থেকে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
সকাল নিউজ/এসএফ

