কালের গহ্বরে নিমজ্জিত হলো আরও একটি বছর। ২০২৫ পেরিয়ে শুরু হলো ২০২৬ সাল। ২০২৫ সালটি বাংলাদেশের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল একটি বছর। বিদায়ী বছরের সর্বাধিক আলোচিত ঘটনা নিয়ে সকাল নিউজের এ আয়োজনে দৃষ্টি রাখা যাক-
১. দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণ:
দেশের রাজনীতিতে এ এক বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি। লাখো কোটি নেতা-কর্মী, সমর্থক-শুভাকাঙ্খীদের শোকের সাগরে ভাসিয়ে ৩০ ডিসেম্বর না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে ৩১ ডিসেম্বর থেকে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়।
১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদতবরণের পর দলের সংকটময় মুহূর্তে তিনি রাজনীতিতে পদার্পণ করেন। ১৯৮২ সালে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ, ১৯৮৩ সালে দলের ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালে চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন তিনি।
আশির দশকে তৎকালীন সামরিক স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দেন। আপসহীন সংগ্রামের কারণে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে জয়লাভ করে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তার সময়েই দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে কোনো আসনেই নির্বাচন করে কখনো পরাজিত হননি।
১/১১ পরবর্তী সরকার তাকে তার দুই সন্তানসহ রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল, চেয়েছিল দেশত্যাগে বাধ্য করতে। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরও খালেদা জিয়ার ওপর নানাভাবে নির্যাতন নিপীড়ন চালানো হয়, ফাঁসানো হয় সাজানো মামলায়, করা হয় কারাবন্দী। কিন্তু এর পরও দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থে তিনি নজিরবিহীন ত্যাগস্বীকার করেন। খালেদা জিয়া বলতেন, ‘আমার এই স্বজনহীন জীবনে দেশবাসীই আমার স্বজন। আল্লাহ আমার একমাত্র ভরসা। আমি যেমন থাকি, যেখানেই থাকি, যতক্ষণ বেঁচে থাকব, দেশবাসীকে ছেড়ে যাব না।’
দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য তার ভালোবাসা ও ত্যাগই তাকে রাজনীতিতে অনন্য এক উচ্চতায় আসীন করেছে।
২. তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন:
১৭ বছরেরও বেশি সময় পর গত ২৫ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে দেশে ফিরেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এদিন বেলা ১১টা ৩৯ মিনিটে বাংলাদেশে পদার্পন করেন তিনি। এরপর ৩০০ ফুটের জুলাই-৩৬ এক্সপ্রেসওয়েতে বিএনপির গণসংবর্ধনায় লাখ লাখ নেতাকর্মী ও সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তৃতা করেন।
মামলার পর মামলা, নিপীড়ন-নির্যাতন আর রাজনীতি থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়ার দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের জেরে ২০০৮ সালে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন তারেক রহমান; চিকিৎসার জন্য চলে যান লন্ডনে। এটি ১/১১ পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের কথা। তার সেই দেশত্যাগ ছিল চরম হতাশা ও গ্লানির। আর কখনো তিনি দেশে ফিরতে পারবেন কী-না, সে বিষয়েও ছিল অনিশ্চয়তা।
শত শঙ্কা পেরিয়ে তিনি ফিরলেন, পথে পথে পদে পদে লাখ লাখ নেতাকর্মী-সমর্থকের ভালোবাসায় সিক্ত হন তিনি। তার এ প্রত্যাবর্তনে নতুনভাবে উজ্জীবিত হয় বিএনপি। অস্থিতিশীল সময়ে নতুন সম্ভাবনার আলো ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচনার ঝড় তোলে তার এ বীরোচিত প্রত্যাবর্তন। দেশের ইতিহাসে এ এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
৩. শরীফ ওসমান হাদি হত্যা:
জুলাই অভ্যুত্থানের পর ইনকিলাব মঞ্চ গঠন করে আলোচনায় আসেন প্লাটফর্মটির আহ্বায়ক এবং তৎকালে ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী শরিফ ওসমান বিন হাদি। আওয়ামী লীগ ও ভারতেরর আগ্রাসনবিরোধী দৃঢ় অবস্থানের কারণে হাদি সা¤প্রতিক সময়ে বেশ আলোচিত ছিলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিন গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে মাথায় গুলিবিদ্ধ হন রিকশায় থাকা হাদি।
গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এরপর এভারকেয়ার হাসপাতাল এবং সর্বশেষ উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারের উদ্যোগে ১৫ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। হাদির মৃত্যুতে শোকে-ক্ষোভে ফুসে ওঠে সমগ্র দেশ। তার মৃত্যুতে ২০ ডিসেম্বর একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়। অপরদিকে, হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচির পাশাপাশি চার দফা দাবি ঘোষণা করে ইনকিলাব মঞ্চ।
৪. ভূমিকম্পের পর ভূমিকম্পে জনমনে আতঙ্ক:
গত ২১ নভেম্বর সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল
ভয়াবহ ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে। এর উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদীতে। এর স্থায়িত্ব ছিল ২৬ সেকেন্ড। এ ভ‚মিকম্পে ঢাকা ও আশপাশের অনেক জেলার মানুষ ঘর ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। রিখটার স্কেলে ৫.৭ মাত্রার এই শক্তিশালী ভূমিকম্পে ঢাকাসহ সারা দেশে দুই শিশুসহ ১১ জন প্রাণ হারায়।
এর মধ্যে শুধু নরসিংদীতেই ৫ জনের মৃত্যু হয়। এতে আহতের সংখ্যা দাঁড়ায় পাঁচ শতাধিক। এরপর মাত্র ৩২ ঘণ্টার মধ্যে দেশে অন্তত চারবার ভূমিকম্প হয়। ফলে দেশের আপামর মানুষের মনে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। প্রশ্ন জাগে, প্রাকৃতিক এ দুর্যোগ মোকাবেলায় এ দেশের সরকার ও মানুষ কতটা প্রস্তুত? বড় ভূমিকম্পের আঘাতে ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানীরই বা কী অবস্থা হবে?
৫. মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি:
ঢাকার আকাশে যুদ্ধবিমান প্রশিক্ষণের বিষয়টা শুনতেই কেমন যেন শরীরটা চমকে ওঠে। প্রশিক্ষণের অনুকূল পরিবেশ না হলেও এমন জনবহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যুদ্ধবিমান প্রশিক্ষণের মহড়া চলেছে। যার চরম মূল্য দিতে হয়েছে দুর্ভাগা এই জাতিকে।
২১ জুলাই ২০২৫। দুপুর ১টা ১৫মিনিট। রাজধানীর উত্তরা ১১নম্বর সেক্টরের মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসের দোতলা ভবনে আছড়ে পড়ে বাংলাদেশ এয়ারফোর্সের একটি প্রশিক্ষণ বিমান। মুহূর্তেই দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে, আগুনে পুড়ে ও চাপা পড়ে প্রাণ হারায় স্কুলের ২৫ জন কোমলমতী শিশু শিক্ষার্থীসহ অন্তত ৩১জন। আহত হন আরও ১৭১ জন। পরে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৫-এ।
যুদ্ধবিমানটি স্কুল ভবনে হঠাৎ আছড়ে পড়ে বিস্ফোরণ ও আগুনে পুড়ে-ঝলসে ছাই হয়ে যায় কুসুমকোমল প্রাণগুলো, খালি হয় বাবা-মায়ের কোল, স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। মর্মস্পর্শী এ ঘটনায় ২২ জুলাই রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হয়।
৬. আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও ইসিতে নিবন্ধন স্থগিত:
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে। সে সময় ছাত্র জনতার তোপের মুখে পড়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন। ২০২৫ সালের ৮ মে চিকিৎসার জন্য সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের দেশত্যাগের প্রেক্ষিতে জুলাই গণহত্যার নির্দেশ প্রদানের অভিযোগ এনে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
এদিন রাতে এনসিপির নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্যের ব্যানারে সারাদেশে আন্দোলন শুরু হয়। সরকারের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করে প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনার সামনে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়। যা পরবর্তীতে দেশের সবচেয়ে পুরনো দল আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনে পরিণত হয়। ১০ মে ২০২৫ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান মামলার রায় না আসা পর্যন্ত সরকার কর্তৃক আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়।
এছাড়া আওয়ামী লীগ এবং এর সব অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতা-কর্মীদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারকাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এসব সংগঠনের যাবতীয় কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করে ১২ মে ২০২৫ প্রজ্ঞাপন জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
সকাল নিউজ/এসএফ

